সম্মানিত নবী পরিবার সম্মেলন ২০১৭

4237563-background-hdمؤتمر آل البيت النبوي الشريف

সম্মানিত নবী পরিবার সম্মেলন ২০১৭

তারিখ: ১৬-১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭

আয়োজনে: জামেয়াতুল ইমাম আল বুখারী, কিষণগঞ্জ, বিহার।

বিষয়: সাহাবীদেরকে গালমন্দ ও দোষারোপ করার ভয়াবহতা


الحمد لله رب العالمين والسلاة والسلام على سيد المرسلين و على آله و صحبه أجمعين أما بعد

সভাপতির আসনে অধিষ্ঠিত সম্মানিত সভাপতি মহাশয়! সেমিনারে উপস্থিত সুযোগ্য লেখক, গবেষক ও বুদ্ধিজীবী মহল! ও সুচিন্তাশীল শ্রোতাবৃন্দ!

শৈশব কালের কোনও এক ক্ষণে পিতার আঙ্গুল ধরে অত্র প্রতিষ্ঠানের অঙ্গনে পা রেখেছিলাম। যে সময় এই সুসজ্জিত প্রশস্ত বিদ্যাপীঠ বলতে একটি মসজিদ, কয়েকটি টিনের কক্ষ এবং গুটিকয়েক চাটাই ও টালি দ্বারা নির্মিত একটি অঙ্কুরের ন্যায় প্রাইমারি বিদ্যালয় ছিল, যা আজ সুবিশাল মহীরুহের রূপ ধারণ করে গৌরবের সাথে সুপ্রতিষ্ঠিত। খুবই আনন্দ লাগে যখন দেখি, শিক্ষাদানের পাশাপাশি এই প্রতিষ্ঠানের একনিষ্ঠ  কর্ণধরগণ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মানের সম্মেলন ও সেমিনারের সফল আয়োজন করেন।যার ফলে দেশ-বিদেশের গবেষক, চিন্তাবিদ ও পণ্ডিতগণের একত্রিত হওয়ার সুযোগ ঘটে এবং তাদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শোনার, বুঝার ও তাদেরকে কাছে পাওয়া ও কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়। আল্লাহ!

আরও সৌভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, এমন ঈর্ষনীয় জ্ঞানমঞ্চে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাওয়া, যার পথ আজ আমার জন্য সুগম করে দেওয়া হয়েছে ফলে আমি এখন আপনাদের মুখোমুখি। এই আনন্দঘন মূহুর্তে সর্ব প্রথমে আমি মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। অত:পর কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি জামেয়াতুল ইমাম বুখারীর প্রতিষ্ঠাতা মাননীয় শাইখ আব্দুল মাতীন সালাফী রাহেমা হুল্লাহকে, যার ইখলাস-একনিষ্ঠতা, ইসলাম দরদী মন, সুন্দর সমাজ, দেশ ও জাতি গঠনের চেতনা এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল হচ্ছে এই ট্রাস্ট-এই জামেয়া। আমি সানন্দে কৃতজ্ঞতা জানাই, তাঁর সুযোগ্য ওয়ারিশ বর্তমান তাওহীদ এডুকেশনাল ট্রাস্টের পরিচালক বন্ধুবর শাইখ মতিউর রাহমানকে, যার দূরদর্শিতা ও পারদর্শিতা এবং দ্বীন, সমাজ ও জাতি গঠনে তাঁর সুচিন্তিত মনোভাবেরই বহি:প্রকাশ হচ্ছে, এই আন্তর্জাতিক সেমিনারের বিশাল আয়োজন। ওয়াফফাকাকুমুল্লাহুল মাযীদ।

সম্মানিত উপস্থিতি! অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, নবীকুল শিরোমণি, সাইয়্যিদুল আম্বিয়া, সত্যবাদী ও মহান আল্লাহ কর্তৃক সত্যায়িত রাসূল, যার আখলাক-চরিত্র হচ্ছে আল কুরআন, যিনি বিশ্বজগতের জন্য রোল মডেল ও উত্তম আদর্শ, যার প্রশংসায় তার শত্রুরাও পঞ্চপুখ, যে তাঁর দায়িত্ব পূর্ণরূপে পালন করেছেন এবং যিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার পূর্বে তার উপর অর্পিত রেসালাতের গুরু দায়িত্ব পূরিপূর্ণভাবে পালন করে গেছে। আর এমন মহান, আদর্শবান ও শ্রেষ্ঠ নবীর সহবতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও তাঁর স্বহস্তে তরবিয়তপ্রাপ্ত জগতসেরা একদল ছাত্রকে যদি কেউ গালমন্দ করে, তাদের অপবাদ দেয়, তাদের প্রতি অভিশাপ দেয়, তাদের প্রতি কটূক্তি করে এবং তাদের খেয়ানত কারী, মুনাফেক এমনকি কাফের পর্যন্ত বলে! আর এমনটি যদি হয় সেই নবীর উম্মতের দাবীদার এক শ্রেণীর লোক দ্বারা, তাহলে আফসোস ও দু:খের সীমা থাকতে পারে কি?

নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিবেদিত সঙ্গী-সাথীগণ অর্থাৎ সাহাবিগণ হচ্ছেন দ্বীন ইসলামের চেইন বা সূত্র। যদি মূলসূত্রই নিন্দনীয়, কলুষিত ও অভিশপ্ত হয়, তাহলে সূত্র দ্বারা প্রচারিত দ্বীন নিন্দনীয়, কলুষিত ও মন্দ হওয়াই যুক্তিসঙ্গত। আর এমনটি হলে সম্পূর্ণ ইসলাম প্রশ্নের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে বাধ্য। ফল স্বরূপ –নাউযুবিল্লাহ- ইসলাম কলুষিত, কুরআন-সুন্নাহ দাগদার, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যর্থ ইত্যাদি ইত্যাদি।

বর্তমান মুসলিম সমাজে এমন এক সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটেছে যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় সাথীদের গালাগালি করে, তাদের মন্দ বলে এবং তাদের অভিশাপ দেয়। নি:সন্দেহে এটি ইসলাম শত্রুদের একটি গোপন চক্রান্ত ও গভীর ষড়যন্ত্র। তারা সরাসরি নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ইসলামকে মন্দ বলার দু:সাহস দেখানে না পেরে ইসলামের মূলসূত্র এবং ইসলামের নিষ্ঠাবান প্রচারকদের টার্গেট করেছে। আল্লাহ তাআলা রহম করুন ইমাম মালেকের প্রতি। তিনি সত্য বলেছেন:

إنما هؤلاء اقوام أرادوا القدح في النبي صلى الله عليه وسلم، فلم يمكنهم ذلك، فقدحوا في اصحابه، حتى يقال رجل سوء ولو كان رجلا صالحا لكان أصحابه صالحون }. ( الصارم المسلول ص580 )

“এরা এমন গোষ্ঠী যারা স্বয়ং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুর্নাম করতে চায় কিন্তু তা সম্ভবপর না হওয়ায় তারা তাঁর সাহাবীদের দুর্নাম করে ও তাদের অপবাদ দেয় যেন বলা হয় যে, তিনি খারাপ লোক ছিলেন। যদি তিনি সৎ ব্যক্তি হতেন, তাহলে তাঁর সাথীরাও সৎ হত।} [আস্ স্বরিম আল মাসলূল, ইবনু তায়মিয়া/৫৮০]

এখান থেকে সাহাবিদের গালাগালি করার বিষয়টির ভয়াবহতা অনুমান করা যেতে পারে এবং এই মন্দ স্বভাবের পরিণাম আঁচ করা যেতে পারে। বিষয়টি এতই স্পর্শকাতর যে, এর কারণে আল্লাহর মনোনীত ধর্ম ইসলাম প্রশ্নের কাঠগড়ায় চলে আসে, ইসলামের বুনিয়াদে কুঠারাঘাত করা হয় এবং সম্পূর্ণ ইসলাম সন্দিহান হয়ে পড়ে।

আলোচ্য প্রবন্ধটিতে সাহাবিগণের সততা ও বিশ্বস্ততা এবং তাদেঁর মান-মর্যাদা প্রথমে কুরআন হতে অত:পর সহীহ সুন্নাহ হতে অত:পর সালাফদের উক্তি হতে বর্ণনা করা হয়েছে। অত:পর তাদের প্রতি অপবাদ ও নিন্দাবাদের কুপ্রভাব কতখানি সুদূরপ্রসারী তারও বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। পরিশেষে সাহাবিদের গালমন্দ করার শারঈ বিধানও উল্লেখ করা হয়েছে। আশা করি পাঠকগণ উপকৃত হবেন এবং আমার এই শ্রম সার্থক হবে। আল্লাহ যেন এই নেক আমল কবুল করেন এবং আখিরাতে নাজাতের কারণ করেন। আমীন।  و ما توفيقي إلا بالله و عليه الثقة والتكلان

******************


আদর্শবান ইসলামে গালাগালির অবকাশ নেই:

সাহাবিগণের মান-সম্মান, সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং মহান আল্লাহ কর্তৃক তাদের সত্যায়ন সম্বন্ধে আলোকপাত করার পূর্বে গালাগালি করা সম্পর্কে ইসলামের অবস্থান এবং সাহাবিদের গালমন্দ করার ভয়াবহ পরিণাম স্পষ্ট করা সঙ্গত মনে করছি, যেন আমরা আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেয়ে যাই এবং  বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম করতে সুবিধা হয়।

ইসলাম একটি সুসভ্য ও আদর্শবান জীবন ব্যবস্থার নাম। সুরুচিসম্পন্ন মার্জিত আচরণ এই দ্বীনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ইসলাম প্রতিপক্ষ ও শত্রুর সাথে ও ভদ্রতা ও সদাচরণের আদেশ দেয় এবং গালাগালি থেকে নিষেধ করে। গালমন্দ করা এই স্বচ্ছ ধর্মের স্বভাব নয়, তাই ইসলামের অনুসারী কেউ কখনো এ ধরণের নোংরা স্বভাবের হতে পারে না এবং এই আচরণকে স্বীকৃতি জানাতে পারে না। হাদীসে উল্লেখ হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

«لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ وَلا اللَّعَّانِ وَلا الْفَاحِشِ وَلا الْبَذِيءِ»

“মুমিন ব্যক্তি অপবাদ দাতা, অভিশাপ দাতা,  অশ্লীল ও মন্দভাষী হতে পারে না।’’ [বুখারী, আদাবুল মুফরাদ ১/১১৬ তিরমিযী, বির ও স্বিলা অধ্যায়, অনুচ্ছেদ: অভিসম্পাত করা নং ১৯৭৭]

গালাগালি করা মুমিনের প্রতীক নয় আর না দ্বীন ইসলামের নিয়ম; কারণ এই স্বভাবের পরিণাম ভয়াবহ। তাই তা থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কঠোর ভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন:  «لَعْنُ الْمُؤْمِنِ كَقَتْلِهِ»

“মুমিনকে অভিসম্পাত করা হত্যা তুল্য’’।  [আহমাদ নং ১৫৭৯০]

তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন: ” سباب المسلم فسوق و قتاله كفر”

“মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসেকী কাজ আর তার সাথে লড়াই করা কুফুরী কাজ” [বুখারী-মুসলিম]

ইসলাম স্পষ্ট ভাষায় অমুসলিমদের দেব-দেবীকেও গালি দিতে নিষেধ করেছে; কারণ এর প্রতিক্রিয়া আরও ভয়াবহ। মহান আল্লাহ বলেন:

ولا تسبوا الذين يدعون من دون الله فيسبوا الله عدوا بغير علم

(তারা আল্লাহকে ছেড়ে যাদের আহ্বান করে, তাদের তোমরা গালি দিবে না। কেননা, তারা শত্রুতাস্বরূপ অজ্ঞতাবশত: আল্লাহকেও গালি দিবে।) [আনআম/১০৮]

মুমিন কেবল উত্তম কথা বলে; কারণ মহান আল্লাহ তাদের সবসময় উত্তম ও উৎকৃষ্ট বলার আদেশ করেছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন:

  وقل لعبادي يقولوا التي هى أحسن إن الشيطان ينزغ بينهم إن الشيطان كان للإنسان عدواً مبيناً

(আমার বান্দাদের বল, তারা যেন উত্তম কথা বলে। নিশ্চয় শয়তান তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উস্কানি দেয়। নিশ্চয় শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু ।) [সূরা ইসরা/৫৩]

মুমিন সাধারণ লোককেই গালমন্দ করতে পারে না। আর যদি সাধারণ লোকদের ক্ষেত্রেই এমন নিষেধাজ্ঞা হয়, তাহলে মর্যাদাবান ও সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের ক্ষেত্রে তা কিরূপ হতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে। অত:পর গালাগালির লক্ষ্য যদি ঐ সম্প্রদায় হয়, যাদের মহান আল্লাহ ভালবাসেন, নিজ কিতাবে মহান আল্লাহ যাদের প্রশংসা করেছেন, যাদের তিনি তাঁর নবীর সাহচর্যের জন্য নির্বাচন করেছেন, যাদের দ্বারা দ্বীন ইসলাম প্রচার-প্রসার লাভ করেছে, তাহলে এমন আচরণ কতখানি জঘন্য ও ন্যক্কারজনক হতে পারে তা সকলে অনুমান করতে সক্ষম। তাদের গালমন্দ করা কেবল পাপকাজ নয়; বরং অপরাধও বটে।

সাহাবিগণ ন্যায়পরায়ণ, মহান আল্লাহর সাক্ষী:

সাহাবিগণের –রিযওয়ানুল্লাহি আলাইহিম- গর্বের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, মহান আল্লাহ তাদেরকে তাঁর নবীর সাহচর্যের জন্য নির্বাচন করেছেন এবং তাদের বর্ণনা মহাগ্রন্থ আল কুরআনে কিয়ামত পর্যন্ত শাশ্বত রেখেছেন। মহান আল্লাহ তাঁর নবী এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গীগণের বর্ণনা এভাবে দিয়েছেন, তিনি বলেন:

مُّحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاء عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاء بَيْنَهُمْ تَرَاهُمْ رُكَّعاً سُجَّداً يَبْتَغُونَ فَضْلاً مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَاناً سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ ذَلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَمَثَلُهُمْ فِي الْإِنجِيلِ كَزَرْعٍ أَخْرَجَ شَطْأَهُ فَآزَرَهُ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَى عَلَى سُوقِهِ يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْراً عَظِيماً

(মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল; আর তার সহচরগণ অবিশ্বাসীদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল; তুমি তাদের রুকু ও সেজদায় অবনত অবস্থায় আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করতে দেখবে। তাদের মুখমণ্ডলে সেজদার চিহ্ন থাকবে, তাওরাতে তাদের বর্ণনা এইরূপ এবং ইঞ্জিলেও । তাদের দৃষ্টান্ত একটি চারা গাছের মত, যা নির্গত করে কিশলয়, অত:পর তাকে শক্ত করে এবং তা পুষ্ট হয় ও দৃঢ়ভাবে কাণ্ডের উপর দাঁড়িয়ে যায়; যা চাষিদের মুগ্ধ করে। যেন অবিশ্বাসীদের অন্তরজ্বালা সৃষ্টি হয়। ওদের মধ্যে যারা বিশ্বাস করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের ক্ষমা ও মহা পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।) [সূরা ফাতহ/২৯]

এই পূর্ণ আয়াতের প্রত্যেকটি অংশ সাহাবায়ে কেরামের মাহাত্ম্য, ফযীলত, ক্ষমা এবং তাদেঁর মহান প্রতিদান লাভের কথাকে সুস্পষ্ট করে। এরপরও সাহাবিদের ঈমানের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা এবং তাদের গালমন্দ করা কিভাবে বৈধ হতে পারে এবং কিভাবে এই মন্দ আচরণের দাবীদার ইসলামের গণ্ডীতে থাকতে পারে?

মহান আল্লাহ ইসলামে অগ্রগামী সেই সমস্ত মুহাজির ও আনসার এবং কেয়ামত পর্যন্ত একনিষ্ঠতার সাথে তাদের অনুসারীদের প্রতি সন্তুষ্টির ঘোষণা দেন এবং তাদের জন্য এমন প্রতিদান ও অনুকম্পার প্রতিশ্রুতি দেন, যা নয়ন দ্বারা কেউ অবলোকন করে নি, কর্ণ দ্বারা কেউ শ্রবণ করে নি আর না কারো অন্তরে তার কল্পনা উদয় হয়েছে।  তিনি বলেন:

والسَّابِقُونَ الأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللّهُ عَنْهُمْ وَرَضُواْ عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَداً ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

(আর যেসব মুহাজির ও আনসার (ঈমান আনয়নে) অগ্রবর্তী এবং প্রথম, আর যেসব লোক সরল অন্তরে তাদের অনুগামী, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাতে সন্তুষ্ট। তিনি তাদের জন্য এমন উদ্যানসমূহ প্রস্তুত করে রেখেছেন, যার তলদেশে নদীমালা প্রবহিত, যার মধ্যে তারা চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে, এ হচ্ছে বিরাট সফলতা।) [সূরা তওবা/১০০]

“আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট’’ বাক্যটির অর্থ হল, আল্লাহ তাআলা তাদের সৎকর্ম গ্রহণ করেছেন, মানুষ হিসাবে তাদের কৃত ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং তিনি তাদের উপর অসন্তুষ্ট নন। যদি তা না হত, তাহলে উক্ত আয়াতে তাদেঁর জন্য জান্নাত ও জান্নাতের নিয়ামতের সুসংবাদ দেওয়া হল কেন? এই আয়াত দ্বারা এটাও জানা গেল যে, আল্লাহর এই সন্তুষ্টি সাময়িক ও ক্ষণস্থায়ী নয়, বরং চিরস্থায়ী। যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর পর সাহাবায়ে কেরামগণের মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত যেমন এক ভ্রান্ত ফেরকার বিশ্বাস, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাদেঁর জান্নাতের সুসংবাদ দিতেন না। এ থেকে এও প্রমাণিত হয় যে, যখন আল্লাহ তাআলা তাদের সমস্ত ত্রুটি মার্জনা করে দিয়েছেন, তখন তাদের সমালোচনা করা, তাদের ভুল-ত্রুটি বর্ণনা করা কোনও মুসলিমের উচিৎ নয়। বস্তুত: এটা ও জানা গেল যে, তাদেঁর ভালবাসা এবং তাদেঁর পদাঙ্ক অনুসরণ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কারণ। আর তাদেঁর প্রতি শত্রুতা, বিদ্বেষ ও ঘৃণা পোষণ করা আল্লাহর সন্তুষ্টি থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ। [তফসীর আহসানুল বায়ান/৩৯৩]

মহান আল্লাহ আরও বলেন:

لِلْفُقَرَاء الْمُهَاجِرِينَ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِن دِيارِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ يَبْتَغُونَ فَضْلا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَاناً وَيَنصُرُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُوْلَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ * وَالَّذِينَ تَبَوَّؤُوا الدَّارَ وَالإِيمَانَ مِن قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِّمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ * وَالَّذِينَ جَاؤُوا مِن بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلاً لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَؤُوفٌ رَّحِيمٌ

(এ সম্পদ) অভাবগ্রস্ত মুহাজিরদের জন্য, যারা নিজের ঘর-বাড়ী ও সম্পত্তি হতে বহিষ্কৃত হয়েছে; তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে সাহায্য করে। তারাই তো সত্যাশ্রয়ী। আর তাদের (মুহাজিরদের আগমনের) পূর্বে যারা এ নগরীতে বসবাস করেছে ও বিশ্বাস স্থাপন করেছে, তারা মুহাজিরদের ভালবাসে এবং মুহাজিরদের যা দেওয়া হয়েছে, তার জন্য তারা অন্তরে ঈর্ষা পোষণ করে না, বরং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তারা তাদের নিজেদের উপর প্রাধান্য দেয়। আর যাদেরকে নিজ আত্মার কার্পণ্য হতে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম। যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এবং ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভাইদের ক্ষমা কর এবং মুমিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে হিংসা বিদ্বেষ রাখো না। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি অতি দয়ার্দ্র, পরম দয়ালু। ) [সূরা হাশর/৮-১০]

মহান আল্লাহ এই আয়াতে ‘মালে ফাই’ কোথায় ব্যয় করা হবে তার সঠিক দিক নির্দেশনা প্রদান করেছেন। অনুরূপ মুহাজির সাহাবীদের ফযীলত, তাদের ঐকান্তিকতা এবং তাদেঁর সততা বর্ণনা করা হয়েছে। অত:পর সাহাবিদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর পরেও তাদেঁর ঈমানের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা, তাদেঁর গালমন্দ করা এবং তাদেঁর ব্যাপারে অন্তরে বিদ্বেষ রাখা আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধাচরণ নয় কি?

মহান আল্লাহ আরও বলেন:

وَالَّذِينَ آمَنُواْ وَهَاجَرُواْ وَجَاهَدُواْ فِي سَبِيلِ اللّهِ وَالَّذِينَ آوَواْ وَّنَصَرُواْ أُولَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقّاً لَّهُم مَّغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ

(যারা ঈমান এনেছে, হিজরত (দ্বীনের জন্য স্বদেশত্যাগ) করেছে, আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং যারা (মুমিনদের) আশ্রয় দান করেছে ও সাহায্য করেছে তারাই প্রকৃত মুমিন। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা।) [সূরা আনফাল/৫২]

যাদের মহান আল্লাহ প্রকৃত মুমিন বলেছেন এবং তাদের ক্ষমার ঘোষণা দিয়েছেন, তাদের গালমন্দ করা জঘন্য আচরণ ছাড়া আর কি হতে পারে!

তিনি আরও বলেন:

لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحاً قَرِيباً

(আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, যখন তারা বৃক্ষতলে তোমার নিকট বায়আত গ্রহণ করল। তাদের অন্তরে যা ছিল, সে সম্বন্ধে তিনি অবগত ছিলেন; তাদের প্রতি তিনি অবতীর্ণ করলেন প্রশান্তি এবং তাদের পুরস্কার দিলেন আসন্ন বিজয়।) [সূরা ফাতহ/১৮]

উক্ত আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বাইয়াতে রিযওয়ানে অংশগ্রহণকারীদের মুমিন আখ্যা দিয়েছেন এবং তিনি তাদের প্রতি সন্তুষ্ট তথা রাযি-খুশীর সার্টিফিকেট দিয়েছেন। তাই মহান আল্লাহ কর্তৃক ঈমান ও সন্তুষ্টি প্রাপ্ত লোকদের গালমন্দ করা কখনই মুমিনের আচরণ হতে পারে না। কারণ মুমিন তাই ভালবাসে যা তার রব ভালবাসেন।

আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন আরও বলেন:

لَقَد تَّابَ الله عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالأَنصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ مِن بَعْدِ مَا كَادَ يَزِيغُ قُلُوبُ فَرِيقٍ مِّنْهُمْ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ إِنَّهُ بِهِمْ رَؤُوفٌ رَّحِيمٌ

(আল্লাহ ক্ষমা করলেন নবীকে এবং মুহাজির ও আনসারদেরকে যারা সংকট মুহূর্তে নবীর অনুগামী হয়েছিল, এমন কি যখন তাদের মধ্যকার এক দলের অন্তর বাঁকা হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তারপর আল্লাহ তাদের ক্ষমা করলেন। নি:সন্দেহে আল্লাহ তাদের প্রতি বড় স্নেহশীল, পরম করুণাময়। ) [সূরা তওবা/১১৭]

‘সংকট মুহূর্ত’ বলতে তাবুক যুদ্ধের অভিযানকে বুঝানো হয়েছে।  গ্রীষ্মকাল, দূর সফর, অল্প সম্বল এবং ফসল কাটার সময় এই অভিযান সংঘটিত হওয়ায় এই অভিযানে অংশগ্রহণকারীদের ‘জায়শুল উসরাহ’ বা সংকটকালের সেনা বলা হয়। মহান আল্লাহ এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। আর দয়াময় আল্লাহ যাদের ক্ষমা করেন, তাদের কেউ গালমন্দ করতে পারে না।

মহান আল্লাহ আরও বলেন:

كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللّهِ وَلَوْ آمَنَ أَهْلُ الْكِتَابِ لَكَانَ خَيْراً لَّهُم مِّنْهُمُ الْمُؤْمِنُونَ وَأَكْثَرُهُمُ الْفَاسِقُونَ

(তোমরাই শ্রেষ্ঠতম জাতি। মানব মণ্ডলীর জন্য তোমাদের অভ্যুত্থান হয়েছে, তোমরা সৎ কাজের নির্দেশ দান করবে, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে, আর আল্লাহকে বিশ্বাস করবে।) [সূরা আল ইমরান/১১০]

‘তোমরাই শ্রেষ্ঠতম জাতি’ এই সম্বোধনটি দ্বারা যদিও মুসলিম জাতিকে বুঝানো হয়েছে কিন্তু সেই জাতির মধ্যে সর্বপ্রথম সাহাবিগণই পরিগণিত হওয়ার বেশী অধিকার রাখেন। তাই আল্লাহ যাদের শ্রেষ্ঠতম বলেছেন, তাদের গালি-গালাজ করা অর্থাৎ তাদের নিকৃষ্ট বলা, যা এই আয়াতের মর্মের স্পষ্ট বিপরীত অবস্থান।

**********


সাহাবাগণের মান-মর্যাদা ও সততা প্রমাণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী:

সাহাবগণের মান-মর্যাদা, সততা ও বিশ্বস্ততা এবং তাদের গালমন্দ না করার বিষয়ে হাদীসে বহু স্বহীহ হাদীস বিদ্যমান। আমরা এই প্রবন্ধে তারই সামান্য বর্ণনা দেয়ার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।

عن أبي سعيد رضي الله عنه قال: قال النبي صلى الله عليه وآله وسلم: «لا تسبوا أصحابي، فلو أن أحدكم أنفق مثل أحد ذهبا ما بلغ مدّ أحدهم، ولا نصيفه»

আবু সাঈদ খুদরী হতে বর্ণিত, নবী স্বল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তোমরা আমার সাহাবাদের গালি দিবে না। তোমাদের মধ্যে কেউ যদি উহুদ পাহাড় বরাবর স্বর্ণ খরচ করে দেয়, তবুও (সওয়াবের দিক দিয়ে) তাদের এক অঞ্জলি বা অর্ধ অঞ্জলি খরচের মত হতে পারে না।’’ [ বুখারী, ফাযায়েলে সাহাবা অধ্যায়, নং (৩৬৭৩)/মুসলিম, ফাযায়েলে সাহাবা নং (২৫৪০)]

উল্লেখিত হাদীসটিতে যেমন সাহাবাগণের মর্যাদা বর্ণনা হয়েছে, তেমন স্পষ্টভাবে তাদের গালি দিতে নিষেধ করা হয়েছে।

ত্বাবারানী তাঁর আল কাবীর গ্রন্থে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন:

قال رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم: «من سبّ أصحابي فعليه لعنة الله، والملائكة، والناس أجمعين»

“যে ব্যক্তি আমার সাথীদের গালি দিবে, তার প্রতি আল্লাহর, ফেরেশতাদের এবং সকল লোকের অভিশাপ হবে”। [ত্বাবারানী, আল কাবীর ১০/২৮৯ নং (১২৫৯১) শাইখ আলবানী সমস্ত সূত্রের আলোকে বর্ণনাটিকে হাসান বলেছেন, সিলসিলা স্বহীহা নং ২৩৪০]

ইমরান বিন হুসাইন হতে বর্ণিত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

(خير أمتي قرني، ثم الذين يلونهم، ثم الذين يلونهم (قال عمران: فلا أدري أذكر بعد قرنه قرنين أو ثلاثة)، ثم إن بعدكم قوماً يشهدون ولا يستشهدون، ويخونون ولا يؤتمنون، وينذرون ولا يفون، ويظهر فيهم السمن)

“আমার উম্মতের শ্রেষ্ঠদের যুগ আমার যুগ অত:পর তার পরের যুগ অত:পর তার পরের যুগ। (ইমরান বলেন: আমার স্মরণ নেই তিনি তাঁর যুগের পর দুই যুগ না তিন যুগ উল্লেখ করেছিলেন), তারপর এমন যুগ আসবে যে সময় লোকেরা নিজে সাক্ষী দিবে অথচ তাকে সাক্ষীর জন্য তলব করা হবে না, খেয়ানত করবে আমানত রক্ষা করবে না, মানত করবে কিন্তু তা পূরণ করবে না এবং তাদের মাঝে মেদবহুল (মোটা শরীর) প্রকাশ পাবে।“ [স্বহীহ আলবুখারী নং (২৫০৮ এবং ৬০৬৪)/ সুনান বায়হাক্বী কুবরা নং (২০১৭৫)]

এই হাদীসে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর যুগের উম্মতকে শ্রেষ্ঠ উম্মত বলেছেন, যে যুগে অবস্থানকারীগণ নি:সন্দেহে তাঁর সাহাবাগন ছিলেন। তাই তারা নবীর উম্মতের মধ্যে শ্রেষ্ঠতর। আর শ্রেষ্ঠ সম্প্রদায় সম্মানের পাত্র গালির পাত্র নয়, বরং তাদের শানে গালি একবারে অসমীচীন।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন:

“آية الإيمان حب الأنصار، وآية المنافق بغض الأنصار”

“আনসার সাহাবীদের ভালবাসা ঈমানের নিদর্শন এবং আনসার সাহাবদের ঘৃণা করা মুনাফেকের নিদর্শন।“ [স্বহীহ বুখারী নং (১৬)/স্বহীহ মুসলিম নং (১০৮)]

আনসার সাহাবা যারা মক্কা থেকে হিজরতকারী সাহাবিগণকে মদিনায় আশ্রয় দিয়েছিলেন। তারা ঈমান ও নেফাক পরিচয়ের মানদণ্ড। যারা তাদের ভালবাসে তারা মুমিন এবং এই ভালবাসা তাদের ঈমানের লক্ষণ। আর যারা তাদের ঘৃণা করে তারা মুনাফিক আর এই ঘৃণা তাদের নেফাকের লক্ষণ। হাদীস খুবই স্পষ্ট যে, যাদের ভালবাসা ঈমানের লক্ষণ তাদের গালিগালাজ করা মুনাফেকির আলামত, যা ঈমান বিধ্ধংসকারী ঘৃণিত অপরাধ।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরোও বলেন:

“يأتي على الناس زمان، فيغزوا فئام الناس فيقولون لهم: فيكم من صاحب رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم؟ فيقولون: لهم نعم فيفتح لهم، ثم يأتي على الناس زمان فيغزو فئام الناس، فيقال: فيكم من صاحب أصحاب رسول الله – صلى الله عليه وآله وسلم -؟ فيقولون: نعم فيفتح لهم، ثم يأتي على الناس زمان، فيغزوا فئام من الناس فيقال: هل فيكم من صاحب أصحاب أصحاب رسول الله – صلى الله عليه وآله وسلم -؟ فيقولون: نعم فيفتح لهم”

“লোকদের উপর এমন সময় আসবে, তখন তাদের একদল জিহাদে লিপ্ত থাকবে। তারপর তাদের কাছে জানতে চাওয়া হবে, তোমাদের মাঝে এমন কেউ আছেন কি যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রত্যক্ষ করেছেন? তারা বলবে, হ্যাঁ। তাঁরা তখন বিজয়ী হবে। তারপর মানুষের মাঝখান থেকে একদল জিহাদ করতে থাকবে। তাদের প্রশ্ন করা হবে, তোমাদের মাঝে এমন কোন লোক আছেন কি, যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লামের সাহাবিগণকে প্রত্যক্ষ করেছেন? তারা তখন বলে উঠবে, জি হ্যাঁ। তখন তারা জয়ী হবে। অত:পর অপর একটি দল যুদ্ধ করতে থাকবে। তখন তাদের প্রশ্ন করা হবে, তোমাদের মাঝে এমন কেউ কি আছেন, যিনি সাহাবীদের সাহচর্য অর্জনকারী অর্থাৎ তাবিঈকে প্রত্যক্ষ করেছেন? তখন লোকেরা বলবে, জি হ্যাঁ। তখন তাদের বিজয় হবে”। [স্বহীহ মুসলিম, অধ্যায়: সাহাবাগণের ফযিলত, নং ৬৩৬১]

উল্লেখিত হাদীসটিতে সাহাবা ও তাবেঈনদের মর্যাদা ও করামত বর্ণনা হয়েছে। তাদের উপস্থিতিতে ইসলাম জয় লাভ করেছে এবং অভিযান সফল হয়েছে। আর এমন মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গকে গালাগালি করা অর্থাৎ তাদের অসম্মান করা, যা মুমিনের কাজ হতে পারে না।

উপরোক্ত হাদীসসমূহ প্রমাণ করে যে, নি:সন্দেহে সাহাবাগণ সৎ ও ন্যায়পরায়ণ; কারণ উপরোক্ত হাদীছে তাদের প্রশংসা ও ফযিলত বর্ণনা হয়েছে যা তাদের সততা ও নিষ্কলুষতার দলীল।

*************


সাহাবাদিগকে গালমন্দকারীদের খণ্ডনে সালাফদের মূল্যবান উক্তি:

ইসলামের সূত্র ন্যায়পরায়ণ সাহাবিদের সম্বন্ধে যারা কটূক্তি করে ও অপবাদ দেয়, তাদের ব্যাপারে আমাদের বিচক্ষণ সালাফগণ বহু মূল্যবান কথা বলেছেন। কারণ তারা এর ভয়াবহ পরিণাম বুঝতেন এবং এসব অপবাদ যে দ্বীনের মৌলিক বিধানের বিপরীত তাও তারা জানতেন।  আমরা এ পর্বে তাদের সেই মূল্যবান উক্তি সমূহের কিছুটা উল্লেখ করবো ইনশাআল্লাহ তা’আলা।

  • ১- ইমাম মালিক রাহ. বলেন:

{ إنما هؤلاء اقوام أرادوا القدح في النبي صلى الله عليه وسلم، فلم يمكنهم ذلك، فقدحوا في اصحابه، حتى يقال رجل سوء ولو كان رجلا صالحا لكان أصحابه صالحون }. ( الصارم المسلول ص580 )

‘এরা এমন গোষ্ঠী যারা স্বয়ং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দুর্নাম করার ইচ্ছা রাখে কিন্তু তা সম্ভবপর না হওয়ায় তারা তাঁর সাহাবীদের দুর্নাম করে ও তাদের অপবাদ দেয় যেন বলা হয় যে, সে মন্দ ছিল। যদি তিনি সৎ ব্যক্তি হতেন, তাহলে তাঁর সাথীরাও সৎ হত’। [আস্ স্বরিম আল মাসলূল, ইবনু তায়মিয়া/৫৮০]

  • ২- ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল রাহ. বলেন:

‘যদি কোনও ব্যক্তিকে দেখ সে কোনও সাহাবীর দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করছে, তাহলে তার ইসলামে সন্দেহ আছে’। [আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনু কাছীর ৮/১৪২]

  • ৩-আবু যুরআহ আর রাযী রহ. বলেন:

‘যদি কোনও ব্যক্তিকে দেখ সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথীদের মধ্যে কারো দোষ বর্ণনা করছে, তাহলে জেনে নিও সে ইসলাম শত্রু  নাস্তিক। কারণ আমাদের নিকট রাসূল সত্য এবং আল কুরআন সত্য। আর এই কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের মাঝে পৌঁছে দিয়েছেন তাঁর সাহাবাগণ। ( অর্থাৎ তারা ইসলামের সূত্র ও সাক্ষী) ইসলাম শত্রুরা আমাদের সাক্ষীদের অভিযুক্ত করতে চায় যেন কিতাব ও সুন্নাহ বানচাল হয়ে যায়। প্রকৃতার্থে তারাই অভিযুক্ত। তারা হচ্ছে নাস্তিক’। [আল কিফায়া, খতীব বাগদাদী, পৃ: ৯৭]

  • ৪- আবু আব্দুর রাহমান নাসাঈ রাহ. কে আল্লাহর রাসূলের সাহাবী মুআবিয়া বিন আবী সুফিয়ান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন:

‘ইসলামের উপমা একটি দরজাযুক্ত ঘরের ন্যায়। আর ইসলামের দরজা হচ্ছে সাহাবাগণ। তাই যে সাহাবীকে কষ্ট দেয়, তার উদ্দেশ্য ইসলাম। ঐ ব্যক্তির মত যে দরজা ঠকঠকায় কারণ তার উদ্দেশ্য ঘরে প্রবেশ করা। তিনি বলেন: তাই যে মুয়াবিয়াকে উদ্দেশ্য করে আসলে তার উদ্দেশ্য সাহাবাগণ’। [তাহযিবুল কামাল,১/৩৩৯/ বুগইয়াতুর রাগিব পৃ: ১২৯]

  • ৫- উমার বিন আব্দুল আযীয রহ. কে সে সব যুদ্ধের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়, যা সাহাবিদের মাঝে সংঘটিত হয়। তিনি বলেন: সে রক্ত থেকে আল্লাহ আমার হাত পবিত্র রেখেছেন, তাই আমার জিহ্বাকে তা থেকে পবিত্র রাখা উচিৎ হবে না কি? আল্লাহর রাসূলের সাথীদের উপমা চোখের মত। আর চোখের ঔষধ হচ্ছে, তা স্পর্শ না করা’। [আল জামি লি আহকামিল কুরআন, কুরতুবী ১৬/১২২]
  • ৬- ইমাম ত্বহাবী রহ. বলেন:

“وحبهم ـ أي الصحابة ـ دين وإيمان، وبغضهم كفر ونفاق وطغيان”

‘তাদেরকে ভালবাসা (অর্থাৎ সাহাবিদের ভালবাসা) দ্বীন ও ঈমানের অংশ এবং তাদের ঘৃণা করা  কুফর, মুনাফেকি ও সীমালঙ্ঘন’। [শারহুত্ ত্বাহাবিয়া/৫২৮]

  • ৭- শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়া রহ. সাহাবিদের মাঝে সংঘটিত বিবাদ সম্পর্কে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের নীতি এই ভাবে বর্ণনা দেন:

‘তারা সাহাবিদের মাঝে সংঘটিত বিবাদ সম্পর্কে নীরবতা পালন করে এবং বলে: তাদের দোষ-ত্রুটি সংক্রান্ত বর্ণিত বর্ণনাগুলির মধ্যে কিছু এমন বর্ণনা রয়েছে যা, মিথ্যা ও জাল আর কিছু এমন রয়েছে যা বিকৃত ও পরিবর্তিত। এ বিষয়ে সঠিক মত হচ্ছে, তারা সে সব বিষয়ে মা’যুর। হয় এমন ইজতিহাদকারী যাদের সিদ্ধান্ত সঠিক কিংবা এমন ইজতিহাদকারী যাদের সিদ্ধান্ত ভুল’। [শারহুল আক্বীদা আল ওয়াসেত্বিয়া, মুহাম্মদ খলীল হার্রাস, পৃ: ১৭৩]

  • ৮- আবু আব্দুল্লাহ ইবনু বাত্তাহ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আক্বীদা বর্ণনা করার সময় বলেন:

‘এরপর আল্লাহর রাসূলের সাহাবিদের মাঝে যে সব বিবাদ হয়, আমরা সে সব বিষয়ে নিরব থাকি। তারা এমন সম্প্রদায় যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সকল অভিযানে উপস্থিত থেকেছেন এবং মর্যাদার ক্ষেত্রে সকলকে ছাড়িয়ে গেছেন; কারণ আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং আমাদের তাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করতে বলেছেন ও তাদের ভালবাসার মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভ করতে বলেছেন। আর এটা তাঁর নবীর মুখে ফরজ করেছেন; অথচ তিনি জানেন যে তারা আপসে লড়াই করবে। তাদের মর্যাদা এ কারণে সকলের ঊর্ধ্বে যে, তাদের ইচ্ছাকৃত ভুল ও তাদের আপসের মধ্যে সংঘটিত কলহ-বিবাদ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে’। [কিতাবুশ্ শার‌হ ওয়াল ইবানাহ আলা উসূলিস সুন্নাহ ওয়াদ্দিয়ানাহ,ইবনু বাত্তাহ পৃ: ২৬৮]

সাহাবীদেরকে গালমন্দ করার ভয়াবহ পরিণাম:

এটা প্রমাণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে মিথ্যা বলা সাধারণ মিথ্যা বলার মত নয়। ঠিক তেমনি সাহাবিদের গালিগালাজ করা সাধারণ লোককে গালমন্দ করার মত নয়, বরং এর ভয়াবহতা ও পরিণাম অনেক সুদূরপ্রসারী। সাহাবিদের গালমন্দকারী শিয়া-রাফেযী সম্প্রদায় সামান্য কিছু সাহাবী ব্যতীত বাকি সকল সাহাবিদের কাফের-মুরতাদ বলে কিংবা ফাসেক বলে কিংবা তাদের সততায় প্রশ্ন তোলে ও অপবাদ দেয়। তাদের সম্বন্ধে এরকম যে কোনও বিশ্বাসই ভয়াবহ। আমরা এ পর্বে তারই কিছুটা বর্ণনা করার প্রয়াস পাবো ইনশাআল্লাহ।

  • ১- অধিকাংশ সাহাবী (রাযি:) কে কাফের কিংবা মুরতাদ মনে করা অথবা তাদের অধিকাংশকে ফাসেক মনে করার পরিণাম হচ্ছে কুরআন ও সুন্নায় সন্দেহ পোষণ করা, কারণ বর্ণনাকারী দোষনীয় হলে বর্ণনাও দোষযুক্ত হবে। ফলে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে, আমরা কিভাবে ঐ গ্রন্থের প্রতি ভরসা করতে পারি, যে গ্রন্থকে ফাসেক ও মুরতাদরা বর্ণনা করেছে। হয়ত: একারণে কতিপয় পথভ্রষ্ট ও বিদআতিদের দেখা গেছে তারা সাহাবিদের গালি দেয়। তারা স্পষ্টভাবে বলে: আল কুরআন অক্ষত নয়; বরং তা বিকৃত। আর অনেকে এ বিশ্বাস প্রকাশ না করে গোপন রাখে।

এ মন্তব্য হাদীসের ক্ষেত্রেও একই ভাবে প্রযোজ্য, কারণ সাহাবাগণ অসৎ কিংবা অভিযুক্ত হলে হাদীসের সনদ অভিযুক্ত হয়ে পড়বে ফলে সম্পূর্ণ হাদীস ভাণ্ডার অগ্রহণীয় হয়ে যাবে।

  • ২- এই ভ্রান্ত মতকে কিছুক্ষণের জন্য মান্যতা প্রদান করলে এর পরিণাম স্বরূপ একথা বলা বৈধ হবে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই উম্মত মন্দ উম্মত এবং এই উম্মতের প্রথম যুগের লোকেরা মন্দ প্রকৃতির ছিল। আর স্বর্ণ যুগের সাধারণ লোকেরা কাফের বা ফাসেক ছিল এবং সেটা ছিল মন্দ শতাব্দী। কত ঘৃণিত মন্তব্য যা তাদের মুখে উচ্চারিত হয়!
  • ৩- এই মতের ফলে দুটি বিষয়ের যে কোনও একটি জরুরি হয়ে যায়। নাউযুবিল্লাহ আল্লাহকে অজ্ঞতার দোষে দোষী করা কিংবা ঐ সমস্ত দলীলাদিকে নিরর্থক মনে করা যাতে সাহাবিগণের প্রশংসা করা হয়েছে।

যদি মহান আল্লাহ তাদের সম্বন্ধে অজ্ঞাত ছিলেন (তিনি তাদের এমন মন্তব্য হতে পুত-পবিত্র) যে, তারা অচিরে কাফের হয়ে যাবে, তারপরেও আল্লাহ তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের জন্য পুরস্কারের অঙ্গীকার করলেন, তাহলে এটা অজ্ঞতা। আর আল্লাহর শানে অজ্ঞতা অসম্ভব।

আর মহান আল্লাহ যদি এটা পূর্ব থেকে জানতেন যে, তারা কাফের হয়ে যাবে তার পরেও তাদের প্রশংসা ও তাদের জন্য পুরস্কারের অঙ্গীকার করা এবং তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হওয়া পরিহাস ছাড়া কিছু নয়। আর আল্লার শানে পরিহাস অসম্ভব। [ইতহাফু যাউইন নাজাবাহ, মুহাম্মাদ বিন আল আরাবী পৃ:৭৫]

এর ফলশ্রুতিতে আল্লাহর হিকমত ও বিধানও প্রশ্নের আওতায় চলে আসে। এই ভাবে যে, আল্লাহ তাদের তাঁর নবীর সাহচর্যের জন্য চয়ন করেন তাই তারা নবীর সাথে সংগ্রাম করে, তাকেঁ সাহায্য সহযোগিতা করে এবং তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  তাদের সাথে আত্মীয়তা সম্পর্ক গড়ে তুলেন। উদাহরণ স্বরূপ যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দুই সুপুত্রীর বিবাহ উসমান (রাযি:) এর সাথে দেন এবং তিনি স্বয়ং আবু বাকর ও উমর রা. এর কন্যাকে বিবাহ করেন। মহান আল্লাহ জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও কিভাবে তাঁর নবীর জন্য এমন সাথী-সঙ্গী ও আত্মীয় নির্বাচন করতে পারেন, যারা ভবিষ্যতে ইসলাম ত্যাগী কাফের হয়ে যাবে?!

  • ৪- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ২৩ বছর ধরে তাঁর সাহাবিদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে অক্লান্ত চেষ্টা চালান, যেন আল্লাহর করুণায় একটি ঐতিহাসিক আদর্শ সমাজ গঠিত হয়। যে সমাজের লোকেরা তাদের আখলাক-চরিত্রে, আল্লাহ ভীরুতায়, ত্যাগ-তিতিক্ষায় ইত্যাদিতে আদর্শবান হয়। পরক্ষণে যদি কেউ এমন বিশ্বাস করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর পর তাঁর সাহাবারা –দু-চার জন ছাড়া- সকলে ইসলাম থেকে ফিরে গেছিলেন কিংবা তারা মুনাফেক ছিলেন কিংবা তারা সৎ ছিলেন না, তাহলে বলা সঙ্গত হবে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মিশনে ব্যর্থ, তাঁর চেষ্টা ব্যর্থ, তিনি অপারদর্শী, তাঁর শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দাওয়াতি নীতি ত্রুটিপূর্ণ এবং –নাউযু বিল্লাহ- তিনি হয়ত: আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত রাসূল নোন। হলে ব্যর্থ হতেন না।

ফলশ্রুতিতে জগতের দাঈ ও মুসলেহগণও আস্থাহীন হয়ে পড়বেন, কারণ নবী হওয়া সত্ত্বেও যদি তিনি সাফল্য না পান তাহলে সাধারণ দাঈরা কিভাবে সাফল্য অর্জন করতে পারে!

সাহাবীদেরকে গালমন্দকারীদের বিধান:

ইসলামী পণ্ডিতগণ এবিষয়ে মতভেদ করেছেন যে, সাহাবাকে গালমন্দকারীর শাস্তি কি হওয়া উচিৎ। তাদের গালমন্দ করা কি কুফুরী যে তার দণ্ড হত্যা হওয়া চাই, না তাদের গালমন্দ করা ফাসেকী কাজ যার ফলে তাকে তা’যীর (তিরস্কার) স্বরূপ শাস্তি দেওয়া চাই?

প্রথম মত: জ্ঞানীদের এক দল মনে করেন, যে সাহাবিদের গালি দেয়, তাদের দোষারোপ করে, তাদের ন্যায়পরায়ণতায় প্রশ্ন তোলে এবং স্পষ্টভাবে তাদের ঘৃণা করে, সে তার রক্ত হালাল করে নেয় তাকে হত্যা করা বৈধ; যতক্ষণে সে তওবা না করে এবং সাহাবিদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ না করে।

ইমাম ত্বাহাবী তাঁর আক্বীদা গ্রন্থে বলেন: তাদের ভালবাসা (সাহাবিদের) দ্বীন ও ঈমান এবং তাদের ঘৃণা করা কুফরী, মুনাফেকী এবং সীমালঙ্ঘন। [শারহুত ত্বহাবিয়া/৫২৮]

যাহাবী বলেন: ‘যে সাহাবিদের দোষারোপ করে কিংবা তাদের গালি দেয়, সে দ্বীন থেকে বের হয়ে যায় মিল্লাতে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়; কারণ তাদের গালমন্দ করা তাদের সম্পর্কে মন্দ বিশ্বাস ও সত্য গোপনের বহি:প্রকাশ এবং মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবে এবং মহা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সুন্নতে তাদের যে প্রশংসা করেছেন, তাদের যে মান-মর্যাদা বর্ণনা করেছেন এবং তাদের যে ভালবাসার বর্ণনা দিয়েছেন সেসবকে অস্বীকার করা হয়। এবং এ কারণেও যে, তাঁরা হচ্ছেন কুরআন ও সুন্নাহর সবচেয় নির্ভরশীল ও পছন্দনীয় সূত্র। আর সূত্রকে দোষারোপ করা মানে মূলকে দোষারোপ করা। বর্ণনাকারীকে ঘৃণা করা মানে বর্ণনাকে ঘৃণা করা। নিফাক, নাস্তিকতা ও অবিশ্বাসী ছাড়া যে কেউই এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে তার নিকট এটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। [আল কাবাইর/২৩৫]

এই মত পোষণকারীগণ নিম্নোক্ত প্রমাণ প্রদান করেছেন:

  • ১- সাহাবিদের গালমন্দ করা, তাদের সমালোচনা করা এবং তাদের দোষারোপ করা হচ্ছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দেওয়া, তাঁর সমালোচনা করা এবং তাঁর অসম্মান করা; কারণ সাহাবিগণ হচ্ছেন তাঁর সাথী যাদের তিনি শিক্ষা দেন এবং পরিশুদ্ধ করেন।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া রহ. বলেন: ‘এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া হত্যাযোগ্য কুফরী কাজ’। [আস স্বরিম আল মাসলূল/৫৮০]

  • ২-সাহাবিদের দোষারোপ করা ও তাদের আঘাত করার সারাংশ হচ্ছে, ইসলামী শরীয়তের সকল বিধান বাতিল ও বানচাল করা; কারণ তারাই সেই বিধান বর্ণনাকারী ও প্রচারকারী।

কুরতুবী রহ. বলেন: ‘যে কেউ তাদের কোনও একজনের অসম্মান করে কিংবা তাদের গালমন্দ করে, সে মহান আল্লাহর খণ্ডন করে এবং মুসলিমদের শরীয়ত বানচাল করে’। [আল জামে লি আহকামিল কুরআন ১৬/২৯৯]

  • ৩-সাহাবিদের গালমন্দ করার পরিণাম ইজমা তথা উম্মতের সর্বসম্মতিকে অস্বীকার করা; কারণ তাদের বিরোধিতা প্রকাশ পাবার পূর্বে তাদের মান-মর্যাদায় কোনও মতভেদ ছিল না এবং কিতাব ও সুন্নতের পৌন:পুনিক সূত্রে এটা সুসাব্যস্ত যে, তাঁরা তাদের রব্বের নিকট সম্মানিত। [আল আজবিবাহ আল ইরাক্বিয়াহ/৪৯]

দ্বিতীয় মত: জ্ঞানীদের আর এক দল মনে করেন, সাহাবাদিগকে গালমন্দ করা কুফরী নয়; বরং এমন করলে সে ফাসেক ও ভ্রষ্ট বিবেচিত হবে। তাকে হত্যার দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে না; বরং কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে। ইসহাক্ব বিন রাহুওয়াইহ বলেন: ‘যে নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথীকে গালি দিবে, তাকে শাস্তি দিতে হবে এবং তাকে জালবন্দী করা হবে’। [আস স্বরিম আল মাসলূল/৫৬৮]

এই মত পোষণকারীগণ নিম্নোক্ত প্রমাণাদি উল্লেখ করেছেন:

  • ১- বুখারী ও মুসলিম তাদের উভয় স্বহীহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আব্দুর রাহমান বিন আউফকে গালি দেয়ার কারণে খালিদ বিন ওয়ালীদকে বলেন: “তোমরা আমার সাহাবিদের গালি দিবে না। যার হস্তে আমার জীবন আছে তার কসম! তোমাদের কেউ যদি উহুদ পর্বত বরাবর স্বর্ণ খরচ করে দেয়, তবুও তাদের এক বা অর্ধাঞ্জলি সমতুল্য হতে পারবে না ”। [বুখারী (৩৩৯৭) মুসলিম (৪৬১১)]

বর্ণনার সারাংশ: উক্ত হাদীসে সাহাবিদের গালমন্দকারীর শাস্তি হত্যা উল্লেখ হয় নি।

  • ২-

روى الإمام أحمد بإسناده إلى أبي برزة الأسلمي قال: أغلظ رجل لأبي بكر الصديق رضي الله عنه قال: فقال أبو برزة: ألا أضرب عنقه قال: فانتهره، وقال: ما هي لأحد بعد رسول الله صلى الله عليه و سلم.

ইমাম আহমাদ স্বীয় সূত্রে আবু বারযা আল্ আসলামী হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: এক ব্যক্তি আবু বাকর সিদ্দীক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সম্পর্কে কঠোর কথা বলে: তখন আবু বারযাহ বললেন: তার গর্দান উড়িয়ে দেব না কি? এটা শুনে তিনি তাকে ধমক দিলেন  এবং বললেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর কারো জন্য এটা প্রযোজ্য নয়”। [মুসনাদ ইমাম আহমাদ ১/৯]

  • ৩-আল্লাহ তা’আলা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া এবং সাধারণ মুমিনদের কষ্ট দেয়ার মাঝে পার্থক্য করেছেন। প্রথমটির ক্ষেত্রে তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশপ্ত বলেছেন এবং দ্বিতীয় প্রকারের ক্ষেত্রে  তিনি বলেন: (সে মিথ্যা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে) [সূরা নিসা/১১২]

কেবল মিথ্যা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করা, হত্যাযোগ্য অপরাধ নয়, বরং সাধারণ দণ্ডযোগ্য।

মতভেদের সারাংশ স্বরূপ বলা যেতে পারে, ইসলামী গবেষকগণ সাহাবাদের গালমন্দকারীর সর্বোচ্চ দণ্ড হত্যা পর্যন্ত বলেছেন আর নিম্ন দণ্ড হত্যা ব্যতীত কঠিন শাস্তির কথা বলেছেন কিন্তু দণ্ড অবধারিত, যা অবশ্যই অপরাধ হওয়া প্রমাণ করে।

উপসংহার

ইসলাম একটি প্রাকৃতিক, স্বচ্ছ ও সুরুচীপূর্ণ ধর্ম, তাতে সাধারণ লোককে কঠোর ভাবে গালি দেওয়া নিষেধ। আর সাধারণ লোকদের ক্ষেত্রে যদি এই বিধান হয়, তাহলে ন্যায়পরায়ণ ও ইসলামের সূত্র মর্যাদাবান রাসূলের সাথীদের গালমন্দ করা কত বড় অপরাধ হতে পারে, তা সহজে অনুমেয়।

সাহাবাদের গালমন্দ করা ও দোষারোপ করা যেমন কুরআন সুন্নাহ বিরোধী তেমন ইসলাম শত্রুতাও বটে। তারা হচ্ছেন ইসলামের দরজা, শরীয়ার সূত্র, ইসলাম প্রচারক, প্রকৃত নমুনা। যদি তারা দোষযুক্ত ও ঘৃণিত হয়ে যান তাহলে সম্পূর্ণ ইসলামই দোষনীয় হয়ে পড়বে। আর এমন জঘন্য ও ন্যক্কারজনক পদক্ষেপ কোনও মুসলিম নিতে পারে না। যারা এমন করে, তারা ভ্রান্ত ও পথ ভ্রষ্ট এবং ইসলাম শত্রুদের ষড়যন্ত্রের শিকার।

আমাদের সম্মানিত সালাফগণ বিষয়টির সূক্ষ্মতা, গভীরতা ও ভয়াবহতা ভালভাবে অনুধাবন করেছেন তাই তারা এ সম্বন্ধে প্রচুর যুক্তিসম্মত সুন্দর জ্ঞানগর্ভ মতামত পেশ করেছেন। আমাদের তাদের জ্ঞানের আলোকে জীবন যাপন সহ এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে তাদের অনুকরণ করা একান্ত কাম্য এবং তাতেই রয়েছে ইহ-পরলৌকিক কল্যাণ।


লেখক: আব্দুর রাকীব বুখারী-মাদানী

প্রভাষক: জামেয়াতুল ইমাম আল বুখারী, কিষণগঞ্জ

প্রাক্তন দাঈ, খাফজী দা’ওয়া সেন্টার, সউদী আরব।
সম্পাদনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব

আপনার মতামত বা প্রশ্ন লিখুন।

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s