অশ্লীল সংস্কৃতি ও ভ্যালেন্টাইন ডে

12080664-kuddus-valentines-day-not-haramঅশ্লীল সংস্কৃতি ও ভ্যালেন্টাইন ডে

শা হ্ আ ব্দু ল হা ন্না ন

ভ্যালেন্টাইন ডে বা ভালোবাসা দিবস নামে বাংলাদেশে কয়েক বছর ধরে একটি নতুন দিবস পালনের সংস্কৃতি শুরু হয়েছে। এটি এখন বিশেষ বিশেষ মহলে পালন করা হচ্ছে। ব্যবসায়িক স্বার্থ ও মুনাফা অর্জনের প্রত্যাশায় একটি ব্যবসায়িক মহল এবং হোটেল ব্যবসায়ীরা এর সাথে যুক্ত হয়ে এটি পালনকে উৎসাহিত করছে। কিন্তু ভ্যালেন্টাইন ডে’র ইতিহাস ও ভিত্তি কী? এ সম্পর্কে আমি ইম্প্যাক্ট ইন্টারন্যাশনাল পত্রিকায় প্রকাশিত প্রখ্যাত স্কলার ড. খালিদ বেগের একটি লেখার অংশ এখানে তুলে ধরলাম।

‘‘আজকাল অনেক মুসলিমই প্রকৃত বিষয়টি না জেনে নানা রকম বিজাতীয় সংস্কৃতির চর্চা করে থাকে। তারা কেবল তাদের সাংস্কৃতিক নেতাদের মতোই এসব ক্ষেত্রে অন্ধ অনুসারী। তারা এটি খুবই কম উপলব্ধি করে যে, তারা যা নির্দোষ বিনোদন হিসেবে করে তার শিকড় আসলে পৌত্তলিকতায়, যা তারা লালন করে তা হলো অবিশ্বাসেরই প্রতীক। তারা যে ধারণা লালন করে তা কুসংস্কার থেকেই জন্ম। এমনকি ইসলাম যা পোষণ করে এসব তার প্রত্যাখ্যান। ভালোবাসা দিবস আমেরিকা ও ব্রিটেন বাদে গোটা ইউরোপে মৃত হলেও হঠাৎ করেই তা মুসলিম দেশগুলোয় আবার প্রবেশ করছে। কিন্তু কার ভালোবাসা? কেন এ দিবস পালিত হবে?
অন্যান্য কিছু ক্ষেত্রে তারা যেমন করে, এ বিষয়েও কথিত আছে খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে উর্বরতা ও পশুর দেবতা বলে খ্যাত লুপারকাসের (Lupercus) সম্মানে পৌত্তলিক রীতিনীতির একটি অংশ হিসেবে রোমানরা ভ্যালেন্টাইন ডে উদযাপন শুরু করে। এর মূল আকর্ষণ হলো পরবর্তী বছরের লটারির আগ পর্যন্ত বর্তমান বছরে লটারির মাধ্যমে যুবকদের মাঝে যুবতীদের বণ্টন করে দেয়া। এ দিন উদযাপনে অন্যান্য ঘৃণ্য অনুষ্ঠানের মধ্যে একটি ছিল, এক টুকরো ছাগলের চামড়ায় আবৃত যুবতীদের দু’জন যুবক কর্তৃক উৎসর্গকৃত ছাগল ও কুকুরের রক্তে ভেজা চাবুক দিয়ে প্রহার করা। মনে করা হতো ‘পবিত্র যুবক’দের প্রতিটি ‘পবিত্র’ আঘাত দ্বারা ওই সব যুবতী ভালোভাবে সন্তান ধারণে সক্ষম হবে।
খ্রিষ্টান সম্প্রদায় যথারীতি লুপারকালিয়ার (Lupercalia) এ ঘৃণ্য রীতিকে বন্ধ করার বৃথা চেষ্টা করল। প্রথমে তারা মেয়েদের নামে লটারির বদলে ধর্মযাজকদের নামে লটারির ব্যবস্থা চালু করল। এর উদ্দেশ্য হলো, যে যুবকের নাম লটারিতে উঠবে সে যেন পরবর্তী একটি বছর যাজকের মতো পবিত্র হতে পারে। কিন্তু খ্রিষ্টানরা খুব কম স্থানেই এ কাজে সফল হলো।

একটি জনপ্রিয় খারাপ কাজকে কিছু পরিবর্তন করে তাকে ভালো কাজে লাগানোর প্রবণতা বহু পুরনো। তাই খ্রিষ্টানরা শুধু লুপারকালিয়া থেকে এ উৎসবের নাম সেন্ট ভ্যালেন্টাইন করতে পারল। পোপ গ্যালাসিয়াস (Gellasius) ৪৯৬ খ্রিষ্টাব্দে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের সম্মানে এটি করল। তথাপি খ্রিষ্টান কিংবদন্তিতে ৫০-এরও বেশি বিভিন্ন রকম ভ্যালেন্টাইন আছে। এদের মধ্যে মাত্র দু’জন সবচেয়ে বেশি পরিচিত, যদিও তাদের জীবন ও চরিত্র এখনো রহস্যাবৃত। একটি কিংবদন্তি হলো, যেটি বেশি প্রকৃত ভ্যালেন্টাইন দিবসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন হলেন ‘প্রেমিকদের যাজক’- যে নিজেকে কারাগারের প্রধানের মেয়ের প্রেমে জড়িয়ে ফেলেন।

কিন্তু কিছু মারাত্মক অসুবিধার জন্য ফ্রান্স সরকার উল্লিখিত লটারি ১৭৭৬ সালে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। কাল পরিক্রমায় এটি ইতালি, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও জার্মানি থেকেও উঠে যায়। এর আগে সপ্তদশ শতাব্দীতে পিউরিটানরা যখন শক্তিশালী ছিল সে সময় ইংল্যান্ডে এটি নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু রাজা দ্বিতীয় চার্লস এটি ১৬৬০ সালে পুনরুজ্জীবিত করেন। ইংল্যান্ড থেকেই এটি নতুন বিশ্বে আগমন করে যেখানে এটিকেই টাকা বানানোর ভালো মাধ্যম হিসেবে নিতে ইয়াংকিরা (আমেরিকানরা) উদ্যোগী হয়। ১৮৪০ সালের দিকে ইস্টার এ হল্যান্ড ‘হোয়াট এলস ভ্যালেন্টাইন’ (What else Valentine) নামে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আমেরিকান ভ্যালেন্টাইন ডে কার্ড বানায় এবং প্রথম বছরই ৫০০০ ডলারের কার্ড বিক্রি হয় (তখন ৫০০০ ডলার অনেক)। সে থেকে ভ্যালেন্টাইন ডে ফুলে ফেঁপে ওঠে।

এটি হ্যালোইনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সাধারণ মানুষ ভূত এবং অপদেবতার মতো পোশাকে সজ্জিত হয়ে পৌত্তলিকদের একটি প্রাচীন শয়তান পূজার পুনঃপ্রচলন করে। পৌত্তলিকেরা এর নাম দেয় সামহাইন (Samhain) যা সোয়েন (Sowen) হিসেবে উচ্চারিত হয়। যেমনটি ভ্যালেন্টাইন ডে’র ক্ষেত্রে ঘটেছিল। খ্রিষ্টানরা এর নাম পরিবর্তন করে ঠিকই, কিন্তু পৌত্তলিক শিকড় পরিবর্তন করতে পারেনি। দৃশ্যত নির্দোষ অনুষ্ঠানেরও পৌত্তলিক শিকড় থাকতে পারে। পূর্বকালে মানুষ ভূতপ্রেতকে ভয় পেত, বিশেষভাবে তাদের জন্মদিনে। একটি প্রচলিত বিশ্বাস ছিল, মন্দ প্রেরণা একজন ব্যক্তির জন্য অধিক বিপজ্জনক যখন কেউ প্রাত্যহিক জীবনে একটি পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা অর্জন করে। যেমন জন্মদিনে বা একটি বছরের শুরুতে। কাজেই সে ব্যক্তির পরিবার ও চার পাশের বন্ধুবান্ধব হাসি-আনন্দের মাধ্যমে জন্মদিনে তাকে মন্দ থেকে রক্ষা করত, যাতে তার কোনো ক্ষতি না হয়।

কী করে একজন সচেতন মানুষ ভাবতে পারে ইসলাম অনৈসলামিক ধারণা এবং বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত অযৌক্তিক আচার অনুষ্ঠানের ব্যাপারে উদাসীন থাকবে?…

এটি একটি বিশাল ট্র্যাজেডি যে মিডিয়ার মাধ্যমে নিত্য বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক অপপ্রচারে মুসলমানেরা ভালোবাসা দিবস (Valentine day) হেলোইন (Halloween) এবং এমনকি সান্তাক্লজকেও (Sant claus) আলিঙ্গন করে নেয়।’’ (ইম্প্যাক্ট ইন্টারন্যাশনাল, লন্ডন, মার্চ ২০০১)।

এটিই ভ্যালেন্টাইন দিবসের ইতিহাস। এ রকম একটি পৌত্তলিকতা ও কুসংস্কারভিত্তিক অনুষ্ঠান বাংলাদেশের মতো একটি দেশে, যেখানে জনগণের শতকরা ৯০ জন মুসলমান সেখানে কিভাবে পালিত হতে পারে? ইসলাম আমাদের প্রকৃত ও অকৃত্রিম ভালোবাসাই শিক্ষা দেয়, যা এ ধরনের অনুষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে না। আমাদের দেশে এটি বর্তমানে তরুণ-তরুণীদের অবাধ মেলামেশা এবং ব্যাভিচারের একটি মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এটি মুসলমানদের এবং বাংলাদেশীদের সংস্কৃতির অংশ নয়। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির এমন কোনো অংশই, যা অশ্লীল এবং অশালীন, আমাদের দেশে অনুমোদন করা উচিত নয়।
এ ব্যাপারে এ অপসংস্কৃতি বন্ধ করতে শিক্ষক, সাংবাদিক, চিন্তাবিদ, আলেম ও সামাজিক কর্মীদের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

উৎস: দৈনিক নয়া দিগন্ত

2 thoughts on “অশ্লীল সংস্কৃতি ও ভ্যালেন্টাইন ডে

  1. ফেসবুকে দাওয়াহ তে যেসকল পোষ্ট করে থাকেন সকল পোষ্ট আমার মেইলে পাঠালে খুব উপকৃত হতাম।

  2. মুহতারাম আসছালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু।প্রশ্নঃপীর ধরা ছারা শাফায়াত হবেনা।এর ব্যাক্ষাদিলে ভালহবে।কারন আমার আব্বাহুজুর একজন পীরের মুরিদ।

আপনার মতামত বা প্রশ্ন লিখুন।

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s