জানাযার বিধান-২য় পর্ব

জানাযার বিধান-২য় পর্ব

(প্রশ্নোত্তরে জানাযার বিধান)

শায়খ আব্দুল আযীয ইবন আব্দুল্লাহ ইবন বায রাহ.

অনুবাদ: শিহাবউদ্দিন হোসাইন

দাফন ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা
প্রশ্ন ১- কবরের উপর পাথরকুচি রাখা ও পানি দেয়ার বিধান কি?
উত্তর – যদি সম্ভব হয় কবরের উপর পাথরকুচি রাখা মুস্তাহাব, কেননা এর ফলে কবরের মাটি জমে থাকে। বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের উপর কাঁচ ভাঙ্গা রাখা হয়েছিল। কবরের উপর পানি ঢালা মুস্তাহাব, যেন মাটিগুলো জমে যায় ও সহজে মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়, ফলে মানুষ তার অবমাননা থেকে মুক্ত থাকবে।
প্রশ্ন ২- লাশ কবরে রেখে মুখ খুলে দেবে কি?
উত্তর – মুখ খুলবে না বরং ঢেকে রাখবে। হ্যাঁ, এহরামাস্থায় যার মৃত্যু হয় তার মুখ খুলে দেবে। আরাফাতের ময়দানে এহরাম অবস্থায় জনৈক ব্যক্তির মূত্য হলে লোকেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার দাফন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

«إغسلوه بماء وسدر وكفنوه في ثوبيه ولا تخمروا رأسه ولا وجهه فإنه يبعث يوم القيامة ملبيا»

“তাকে কুলপাতা মিশ্রিত পানি দ্বারা গোসল দাও এবং এহরামের দু’কাপড়ে কাফন দাও, তার মাথা ও মুখ ঢেকো না, কারণ কিয়ামতের দিন সে তালবিয়া পড়তে পড়তে উঠবে”। (বুখারি ও মুসলিম)
প্রশ্ন ৩- অনেকেই মুখ খোলা রাখা ও পাথর রাখার বিষয়টি খুব গুরুত্ব দেয়, মূলত এর কোন ভিত্তি আছে কি?
উত্তর – এ ধরণের কথার কোন ভিত্তি নেই, এটা মুর্খতা ও অজ্ঞতার আলামত।
প্রশ্ন ৪- মৃত ব্যক্তি যদি তার লাশ অন্য কোন শহরে দাফন করার জন্য অসিয়ত করে, তাহলে তার এ অসিয়ত পুরো করা কি ওয়াজিব?
উত্তর – না, তার এ অসিয়ত পুরো করা ওয়াজিব নয়, সে যদি কোন মুসলিম শহরে মারা যায়, তাহলে তাকে ঐ শহরেই দাফন করা বাঞ্চনীয়।
প্রশ্ন ৫- দাফন করার সময় মহিলাদের কবর ঢেকে রাখার বিধান কি?
উত্তর – এটা উত্তম।
প্রশ্ন ৬- মৃত ব্যক্তি যদি জীবিতদের জুতার আওয়াজ শুনতে পায়, তাহলে সে তালকিন অবশ্যই শুনতে পাবে, এ ধরণের মন্তব্য কতটুকু সঠিক?
উত্তর – শরিয়ত অনুমোদিত সকল ইবাদত নির্ধারিত ও সীমাবদ্ধ, এতে অনুমান বা ধারণার কোন অবকাশ নেই। মৃত ব্যক্তি জীবিতদের পায়ের ধ্বনি শোনে ঠিক, কিন্তু এর ফলে তার কোন ফায়দা হয় না।
মৃত্যুর ফলে মানুষ দুনিয়া হতে আখেরাতে ফিরে যায়, কর্মস্থল ত্যাগ করে ভোগের জায়গায় প্রত্যাবর্তন করে।
প্রশ্ন ৭- কবর খননের লাহাদ ও শেক তথা সিন্দুক ও বগলি এ দু’প্রকারের মধ্যে কোনটি উত্তম এবং দাফন শেষে কবর কতটুকু উঁচু করবে?
উত্তর – মদীনাবাসী লাহাদ খননেই অভ্যস্ত ছিল, তবে কখনো কখনো শেকও খনন করত, যেহেতু আল্লাহ তাআলা তার হাবীব মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্যে লাহাদ পছন্দ করেছেন, তাই লাহাদই উত্তম, তবে শেকও জায়েয, বিশেষ করে যখন কোন প্রয়োজন দেখা দেয়। সাহাবি ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,

اللحد لنا والشق لغيرنا

“লাহাদ আমাদের জন্যে আর শেক অন্যদের জন্যে”। এ হাদিসটি খুবই দুর্বল। কারণ এ হাদিসের সনদে বিদ্যমান আব্দুল-আ’লা আছ্ছালাবী নামক জনৈক বর্ণনাকারী হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য নয়। আর কবর উঁচু করা হবে এক বিঘত বা তার কাছাকাছি পরিমাণ।
প্রশ্ন ৮- অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, মৃতের ওলী ওয়ারিসগণ উপস্থিত লোকদের উদ্দেশ্যে বলেন, সম্মানিত উপস্থিতি আপনারা আপনাদের দাবি-দাবা মাফ করেদিন, তাকে ক্ষমা করে দিন, তার জন্যে সবাই আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করুন। এ জাতীয় প্রথা কি শরিয়ত সম্মত?
উত্তর – এ জাতীয় প্রথার কোন ভিত্তি আছে আমার জানা নেই। হ্যাঁ, যদি জানা থাকে যে, মৃত্যুবরণকারী লোকটি মানুষের উপর জুলুম করেছে তাহলে বলা যেতে পারে যে, আপনারা আপনাদের দাবী মাফ করেদিন। অন্যথায় শুধু এ কথা বলাই যথেষ্ট যে, আপনারা তার জন্যে আল্লাহর নিকট দু’আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
প্রশ্ন ৯- কবর বা কবরস্থানের রাস্তা আলোকিত করার বিধান কি?
উত্তর – যদি তা মানুষের উপকার্থে বা লাশ দাফনের সুবিধার্থে করা হয় তাহলে জায়েয, যেমন প্রাচীর ঘেরা গোরস্থান যেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণ আলো নেই, লাশ দাফনের সুবিধার্থে সেখানে আলোর ব্যবস্থা করা বৈধ। অন্যথায় কবরের উপর বাতি জালানো বা কবরকে আলোকসজ্জা করা নাজায়েয। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لعن رسول الله صلى الله عليه وسلم زائرات القبور والمتخذين عليها المساجد والسرج» (رواه الترمذي)

“কবর যিয়ারতকারী নারী, কবরের উপর মসজিদ নির্মাণকারী ও তাতে আলোকসজ্জাকারীদের উপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লানত করেছেন”। (তিরমিজি)
অনুরূপ যদি মানুষের চলাচলের সুবিধার্থে রাস্তায় বাতি দেয়া হয় আর তাতে কবর কিছুটা আলোকৃত হয় তবুও দোষের কিছু নেই। অনুরূপ লাশ দাফনের জন্যে বাতি জালানোতে কোন সমস্যা নেই।
প্রশ্ন ১০- মাইয়্যেতের সাথে চলার সুন্নত তরিকা কি?
উত্তর – মাইয়্যেতের সাথে জানাযার স্থানে যাবে, অতঃপর গোরস্থানে দাফন শেষ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«من تبع جنازة مسلم إيمانا واحتسابا وكان معها حتى يصلى عليها ويفرغ من دفنها فإنه يرجع بقيراطين كل قيراط مثل جبل أحد» (رواه البخاري)

“যে ব্যক্তি ঈমানের সহিত ও সাওয়াবের আশায় কোন মুসলিমের জানাযায় অংশ গ্রহন করল এবং দাফন পর্যন্ত তার সাথে থাকল ও তার দাফন কর্ম শেষ করল, সে দু’কিরাত নেকি নিয়ে ফিরবে, প্রত্যেক কিরাত ওহুদ পাহাড় পরিমাণ”। (বুখারি)
প্রশ্ন ১১- মৃত ব্যক্তির জন্য ইস্তেকামাতের দু’আ কখন করবে, দাফনের পর না দাফনের মাঝে?
উত্তর – দাফন শেষ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম দাফনের কাজ শেষ করে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন,

«استغفروا لأخيكم ، واسألوا الله له التثبيت فإنه الآن يسأل» (رواه أبوداود)

“তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা পার্থনা কর এবং আল্লাহর নিকট তার জন্য ইস্তেকামাতের দো‘আ কর, কারণ এখন তাকে প্রশ্ন করা হবে। [আবু দাউদ]

প্রশ্ন ১২- কবর আযাব প্রসঙ্গে অনেক ঘটনা বর্ণনা করা হয়, যেমন জনৈক ব্যক্তিকে দাফন করার উদ্দেশ্যে কবরে রাখা হলে সাপ বেরিয়ে আসে, যখন অন্য কবরে রাখা হয় সেখানেও সাপ বেরিয়ে আসে ইত্যাদি, এ সবরে ভিত্তি কতটুকু?
উত্তর – ঘটনার সত্যতা সমন্ধে আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন, তবে এ ধরণের ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আল্লামা ইবনে রজন রাহিমাহুল্লাহ নিজ গ্রন্থ “আহওয়ালুল কবর” এ প্রসঙ্গে অনেক ঘটনা বর্ণনা করেছেন, যেগুলোর বিশুদ্ধতা সম্পর্কে আল্লাহই ভাল জানেন।
প্রশ্ন ১৩- ওয়াজ ও নসিহতের সময় এসব ঘটনা উপাস্থাপন বলা কি ঠিক?
উত্তর – এসব ঘটনার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে যেহেতু জানা যায়নি, তাই এগুলো না বলা উত্তম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা যা প্রমাণিত তাই যথেষ্ট। মূল বিষয় হচ্ছে মানুষদেরকে ইবাদতের প্রতি উৎসাহ দান করা ও গুনাহের প্রতি নিরুৎসাহিত করা। যেমনটি করেছিলেন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবায়ে কিরাম। এ ছাড়া বাস্তব-অবাস্তব কিচ্ছা-কাহিনী না বলাই ভাল।
প্রশ্ন ১৪- এক কবরে নারী-পুরুষ উভয়কে দাফন করা কি জায়েয?
উত্তর – এতে কোন সমস্যা নেই, প্রয়োজনে দেয়া যেতে পারে, যখন যুদ্ধ বা মহামারি ইত্যাদি কারণে অনেক লাশ একত্র জমা হয়।
প্রশ্ন ১৫- লাশ কবরে রেখে বাঁধন খুলে দেবে কি?
উত্তর – বাঁধন খুলে দেয়া উত্তম, সাহাবিগণ এরূপ করতেন।
প্রশ্ন ১৬- কবরের উপর কোন চিহ্ন স্থাপন করা জায়েয আছে কি?
উত্তর – কবরের উপর পাথর, হাড্ডি বা লোহা ইত্যাদি দ্বারা চিহ্ন স্থাপন করার দোষণীয় নয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম সাহাবি ওসমান ইবন মাজউন রাদিয়াল্লাহু আনহুর কবরের উপর চিহ্ন স্থাপন করেছিলেন।
প্রশ্ন ১৭- মৃতকে কেবলামুখি করে রাখা সুন্নত না মুস্তাহাব?
উত্তর – মৃতকে কেবলামুখী করে রাখা সুন্নত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«الكعبة قبلتكم أحياء و أمواتا» (رواه أبو داود)

“জীবিত ও মৃত উভয় অবস্থায়ই বাইতুল্লাহ তোমাদের কিবলা”। (আবুদাউদ)
তাই মৃতকে ডান পাঁজরে শুইয়ে কেবলামুখী করে রাখবে।
প্রশ্ন ১৮- কবর সংস্কার করা কি জায়েয?
উত্তর – প্রয়োজন হলে কবর সংস্কার করা যায়, যেমন কবরের নির্দিষ্ট জায়গা ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে বা অন্য কোন প্রয়োজনে।
প্রশ্ন ১৯- মৃতুদের হাড্ডি জীর্ণ হয়ে গেলে সেগুলো অন্যত্র স্থানান্তর করা কি জায়েয?
উত্তর – প্রয়োজন হলে স্থানান্তর করা যাবে, অন্যথায় নিজ স্থানে কবর বহাল থাকবে।
প্রশ্ন ২০- দিনে লাশ দাফন করা উত্তম, এ কথার ভিত্তি কি?
উত্তর – নিষিদ্ধ তিন সময় ব্যতীত যে কোন সময় লাশ দাফন করা বৈধ, সাহাবি উকবা ইবন আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ “আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন সময় নামাজ পড়তে ও আমাদের মৃতদেরকে দাফন করতে নিষেধ করেছেন, সূর্যাস্ত, সূর্যোদয় ও ঠিক দ্বিপ্রহরের সময়, যতক্ষণ না তা হেলে যায়।
প্রশ্ন ২১- মৃত ব্যক্তি যদি মহিলা হয়, আর তার কোন অভিভাবক যদি উপস্থিত না থাকে, তাহলে পুরুষগণ স্বেচ্ছায় তার লাশ কবরে রাখার ব্যাপারে কি সহযোগিতা করতে পারবে?
উত্তর – মৃত মহিলার অভিভাবক উপস্থিত থাকা সত্বেও তার লাশ কবরে রাখার ব্যাপারে স্বেচ্ছায় পুরুষরা সহযোগিতা করতে পারবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত থাকা সত্বেও তাঁর এক মেয়ের লাশ অন্য পুরুষরা কবরে নামিয়ে ছিল।
প্রশ্ন ২২- কোন মসজিদে যদি কবর থাকে, যা স্থানান্তরে ফিতনার আশঙ্কা হয়, তাহলে সে কবরটি স্থানান্তর করা কি ওয়াজিব?
উত্তর – এমতাবস্থায় দেখতে হবে যে কোনটি আগে, কবর না মসজিদ, যদি মসজিদ আগে নির্মাণ হয়, তাহলে মসজিদ ঠিক রেখে কবর নিঃশেষ করতে হবে, তবে এ কাজটি আদালত বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে করা যেন কোন ধরণের ফিতনা সৃষ্টি না হয়। আর যদি কবর আগে স্থাপিত হয়, তাহলে কবর ঠিক রেখে মসজিদ ভেঙ্গে ফেলতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছন,

«لعن الله اليهود والنصارى اتخذوا قبور أنبيائهم مساجد» (متفق على صحته)

“ইয়াহূদী ও নাসারাদের উপর আল্লাহর অভিশাপ, তারা তাদের নবিদের কবরসমূহকে মসজিদে পরিণত করেছে”। (বুখারি ও মুসলিম)
এমনিভাবে মুমিন জননী উম্মে-সালমা ও উম্মে হাবিবা রাদিয়াল্লাহু আনহা হাবশায় অবস্থিত গীর্জা ও তাতে নির্মিত মূর্তি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সংবাদ দিলে, তিনি বলেনঃ

«أولئك إذا مات فيهم الرجل الصالح بنوا على قبره مسجدا وصوروا فيه تلك الصور أولئك شرار الخلق عند الله» (رواه البخاري ومسلم)

“তারা এমন যে, যখন তাদের কোন নেককার লোক মারা যায়, তারা তার কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করে ও তাতে তার ছবি অঙ্কন করে, এরাই আল্লাহর নিকট নিকৃষ্টতম মাখলুক”। (বুখারি ও মুসলিম)
হাদিস দু’টি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কবরের উপর নির্মিত মসজিদে নামাজ পড়লে তার নামাজ শুদ্ধ হবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরণের মসজিদে নামাজ পড়তে নিষেধ করেছেন, কারণ এটা শিরকে আকরের মাধ্যে গণ্য।
প্রশ্ন ২৩- এক কবরে দু’লাশ রাখার পদ্ধতি কি?
উত্তর – দু’জনের মধ্যে যে অধিক সম্মানী তাকে প্রথমে কিবলা মুখী করে রাখবে, অতঃপর দ্বিতীয় ব্যক্তিকে রাখবে। উভয়কে ডান পাজরের উপর কিবলামুখী করে শোয়াবে। যদি তিন ব্যক্তিকে একই কবরে দাফন করতে হয়, তাহলে তৃতীয় ব্যক্তিকে পূর্বের দু’জনের পাশে শোয়াবে। বর্ণিত আছে যে, ওহুদ যুদ্ধে শাহাদতবরণকারী সাহাবাদের লাশের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন দু’জন, দু’জন ও তিনজন তিনজন করে এক-এক কবরে দাফন কর। যে কোরআনে অধিক পারদর্শী তাকে আগে রাখ।
প্রশ্ন ২৪- দাফন করার সময় নিম্নে বর্ণিত আয়াত পাঠ করার বিধান কি?

﴿مِنۡهَا خَلَقۡنَٰكُمۡ وَفِيهَا نُعِيدُكُمۡ وَمِنۡهَا نُخۡرِجُكُمۡ تَارَةً أُخۡرَىٰ ٥٥﴾ [طه:55]

“মাটি থেকেই আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, মাটিতেই আমি তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেব এবং এ মাটি থেকেই তোমাদেরকে পুনরায় বের করে আনব”। সূরা তা-হা: (৫৫)
উত্তর – দাফনের সময় এ আয়াত বলা সুন্নত তবে এর সাথে আরো যুক্ত করবে—

بِسْمِ اللهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُوْلِ اللهِ» – رواه ابوداود

“আল্লাহর নামে ও তার রাসূলের তরিকা অনুযায়ী এ লাশ দাফন করছি”। (আবু দাউদ)

প্রশ্ন ২৫- কাফনের কাপড়ে কালিমায়ে তাইয়্যিবা লিখা, অথবা কাগজে লিখে তা কাফনে রেখে দেয়া কেমন?
উত্তর – এ ধরণের কাজের কোন ভিত্তি নেই। শরিয়ত স্বীকৃত কাজ হচ্ছে উপস্থিত লোকজন মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কালিমায়ে তাইয়্যিবা তালকিন করবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لقنوا موتاكم لا إله إلا الله» (رواه مسلم)

“তোমরা তোমাদের মৃতদেরকে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর তালকিন কর”। (মুসলিম) যেন মৃতের সর্বশেষ কথা “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” হয়। এ ছাড়া কাফনের উপর বা কবরের দেয়ালে কালিমা লেখার কোন বিধান নেই।
প্রশ্ন ২৬- কবরের পাশে দাড়িয়ে ওয়াজ করা কেমন?
উত্তর – কবরের পাশে দাড়িয়ে ওয়াজ করতে নিষেধ নেই, এটা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত নয়, সাহাবি বারা ইব্‌ন আজেব রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের পাশে দাড়িয়ে ওয়াজ করেছেন।


সান্ত্বনা দান ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা
প্রশ্ন ১- শোকবার্তা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া ও তাদের সাথে বৈঠক করা কি বৈধ?
উত্তর – শোকাহত মুসলিম পরিবারকে সান্ত্বনা দেয়া মুস্তাহাব, এর মাধ্যমে তাদেরকে সুহৃদয়তা দেখানো হয়। এ সময় যদি তাদের নিকট চা, কফি ইত্যাদি পান করে বা আতর ইত্যাদি গ্রহণ করে, যা সাধারণত অন্যান্য সাক্ষাত প্রার্থীদের সাথে করা হয়, এতে কোন সমস্যা নেই।
প্রশ্ন ২- শোক প্রকাশের সময় এ কথা বলা কেমন যে, সে তার শেষ ঠিকানায় চলে গেছে?
উত্তর – আমার জানামতে তাতে কোন সমস্যা নেই, কারণ দুনিয়ার তুলনায় পরকাল নিশ্চয় তার শেষ ঠিকানা। তবে মুমিনদের সত্যিকারের শেষ ঠিকানা হচ্ছে জান্নাত আর কাফেরদের শেষ ঠিকানা হচ্ছে জাহান্নাম।
প্রশ্ন ৩- সান্ত্বনা দেয়ার উদ্দেশ্যেঃ

﴿يَٰٓأَيَّتُهَا ٱلنَّفۡسُ ٱلۡمُطۡمَئِنَّةُ ٢٧﴾ [الفجر:27]

“হে প্রশান্ত আত্মা” [ফজর: ২৭] বলে মৃতকে সম্বোধন করা কেমন?
উত্তর – এ ধরণের বাক্য পরিত্যাগ করা উচিত, কারণ তাদের জানা নেই যে মৃতের আত্মা বাস্তবিকেই কেমন। শরিয়ত অনুমোদিত আমল হচ্ছে মৃতের জন্যে প্রার্থনা করা, তার জন্যে ক্ষমা ও রহমতের দো‘আ করা।
প্রশ্ন ৪- পেপার পত্রিকায় শোকপ্রকাশ করা কেমন, এটাকি মাতমের অন্তর্ভূক্ত?
উত্তর – এটা নিষিদ্ধ মাতমের অন্তর্ভূক্ত না হলেও বর্জন করা উচিত, কারণ এতে নিষ্প্রয়োজনে অনেক অর্থ ব্যয় হয়।
প্রশ্ন ৫- মৃতের অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী তিন দিন পর্যন্ত মৃতের বাড়িতে অবস্থান করে, এটা কেমন?
উত্তর – মৃতের পরিবারের সাথে হৃদ্যতা প্রকাশের জন্য সেখানে তিন অবস্থান করা বৈধ, তবে এ ক্ষেত্রে ওলিমার ন্যায় লোকদের জন্য খাওয়ার অনুষ্ঠান করবে না।
প্রশ্ন ৬ – সান্ত্বনা দেয়ার জন্য কি কোন নির্ধারিত সময় আছে?
উত্তর – আমার জানামতে এর জন্য নির্ধারিত কোন সময় নেই।
প্রশ্ন ৭- শোকাহত পরিবারকে খানা পৌঁছানো বাবদ জবেহকৃত প্রাণী পাঠিয়ে দেয়া কেমন?
উত্তর – দেয়া যেতে পারে, নিকটতম আত্মীয়দের দ্বারা তা রান্না করে নেবে। মুতার যুদ্ধে সাহাবি জাফর ইবন আবু তালিব শাহাদত বরণ করলে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরিবারের লোকদেরকে বললেন, তোমরা জাফরের পরিবারের জন্য খানা তৈরি করে পাঠিয়ে দাও, কারণ তারা কঠিন বিপদগ্রস্ত খানা তৈরির মানষিকতা তাদের নেই।
প্রশ্ন ৮- মৃত ব্যক্তি অসিয়ত করেছে যে, তার ইন্তেকালের পর যেন বিলাপ করা না হয়, তবও যদি কেউ তার জন্য বিলাপ করে, তাহলে কি মৃতকে আযাব দেয়া হবে?
উত্তর – তার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন, প্রত্যেকের উচিত তার আপনজনদেরকে এ বিষয়ে সতর্ক করা। ওয়ারিসদের সতর্ক করার পরও যদি কেউ তার জন্য বিলাপ করে তাহলে ইনশাল্লাহ সে অপরাধী বলে সাব্যস্ত হবে না। মহান আল্লাহ তালা বলেন,

﴿وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٞ وِزۡرَ أُخۡرَىٰۚ ١٨﴾ [فاطر:18]

“আর কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না”। সূরা ফাতিরঃ (১৮)
প্রশ্ন ৯- শোকাহত পরিবারের জন্য প্রেরিত দুপর বা রাতের খাবারে অন্য কেউ অংশগ্রণ করলে তা কি মাতম বা বিলাপে পরিণত হবে?
উত্তর – না, তা মাতমের অন্তর্ভূক্ত হবে না। কারণ আগত লোকদের জন্য শোকাহত পরিবার খানার ব্যাবস্থা করেনি, বরং অন্যরা তাদের জন্য ব্যাবস্থা করেছে, আর তা অতিরিক্ত হওয়ায় অন্যরা তাতে অংশগ্রহণ করেছে, তাই এতে কোন সমস্যা নেই।
প্রশ্ন ১০ – অনিচ্ছায় যদি ক্রন্দনের মধ্যে বিলাপ এসে যায় তাহলে তার হুকুম কি?
উত্তর – বিলাপ সর্বাস্থায় না জায়েয, তবে চক্ষু অশ্রুশিক্ত ও অন্তর বিষণ্ন হতে পারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুত্র ইব্রাহিমের ইন্তেকালের পর তিনি বলেছেন,

«العين تدمع و القلب يحزن ولا نقول إلا ما يرضى الرب و إنا لفراقك يا إبراهيم لمحزونون» رواه البخاري)

“চক্ষু অশ্রু বিসর্জন করছে, অন্তর ব্যথিত হচ্ছে, তবুও প্রভূর অসন্তুষ্টির কারণ হয় এমন কথা বলব না, হে ইব্রাহীম, তোমার বিরহে আমরা ব্যথিত”। (বুখারি)
প্রশ্ন ১১ – শোকপ্রকাশের জন্য সফর করা ও শোকাহত লোকদের নিকট অবস্থান করা কেমন?
উত্তর – এ বিষয়টি শোকাহত লোকদের অবস্থার উপর নির্ভর করবে, তারা যদি এতে আন্দবোধ করে তাহলে তাদের নিকট অবস্থান করতে কোন সমস্যা নেই, অন্যথায় নয়।
প্রশ্ন ১২ – ফকিহগণ বলেছেন, স্বামী ব্যতীত অন্য কারো জন্য সর্বোচ্চ তিন দিন শোক প্রকাশ করা বৈধ, অর্থাৎ সাজসজ্জ্বা ত্যাগ করা, কথাটি কতটুকু সত্য?
উত্তর – কথাটি সম্পূর্ণ সঠিক, বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা তা প্রমাণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لا تحد امرأة على ميت فوق ثلاث إلا على زوج أربعة أشهر وعشرا» (متفق عليه)

“কোন নারী মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশী শোক প্রকাশ করেব না, তবে তার স্বামীর জন্য চারমাস দশদিন শোক প্রকাশ করবে”। (বুখারি ও মুসলিম)
প্রশ্ন ১৩ – শোকাহত পরিবার নিজেদের খানা নিজেরা পাক করতে পারবে কি?
উত্তর – হ্যাঁ, তারা নিজেদের খানা নিজেরা রান্না করবে, এতে কোন সমস্যা নেই, তবে কারো জন্য পাকাবে না।
প্রশ্ন ১৪ – মৃত ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে শোকগাথা ছন্দ বা কবিতা পাঠ করা কি মাতমের অন্তর্ভূক্ত?
উত্তর – মৃতকে উদ্দেশ্যে করে শোকগাথা ছন্দ বা কবিতা পাঠ করা হারাম ও নিষিদ্ধ মাতমের অন্তর্ভূক্ত হবে না। তবে কারো প্রশংসায় সীমাতিরিক্ত করা কোন অবস্থাতে জায়েয হবে না। যেমন করে থাকে কবি ও গায়কগণ।
প্রশ্ন ১৫ – পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে শোকবার্তা পাঠনো কেমন?
উত্তর – বিষয়টি বিবেচনা সাপেক্ষ, কারণ এটা একটি ব্যয়বহুল কাজ, তবুও যদি সত্যবাণী দ্বারা শোকপ্রকাশ করা হয় তবে জায়েয, তবে এভাবে না করাই উত্তম। শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, তাদের নিকট পত্র পাঠাবে বা মোবাইল করবে, বা সাক্ষাত করবে।

চলবে ইনশাআল্লাহ…

আরও পড়ুন: জানাযার বিধান-১ম পর্ব

উৎস: জানাযার কিছু বিধান
শায়খ আব্দুল আযীয ইব্‌ন আব্দুল্লাহ ইব্‌ন বায রাহিমাহুল্লাহ
অনুবাদ : শিহাবউদ্দিন হোসাইন
সম্পাদনা : সানাউল্লাহ নজির আহমদ
ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
من أحكام الجنائز
« باللغة البنغالية »
الشيخ عبد العزيز بن عبد الله بن باز رحمه الله
ترجمة: شهاب الدين حسين
مراجعة: ثناء الله نذير أحمد

আপনার মতামত বা প্রশ্ন লিখুন।

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s