ফিরে এলো রামাযান…. কিন্তু মুসলিম জীবনে ঈমানী পরিবর্তন কবে?

ফিরে এলো রামাযান….
কিন্তু মুসলিম জীবনে ঈমানী পরিবর্তন কবে?
আব্দুর রাকীব (মাদানী)

আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন, ওয়াস্ স্বালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মা বাদ।
ভাই মুসলিম! আমাদের মাঝে প্রতি বছরে রামাযান মাস আসে আর চলে যায়। আগমনের সাথে সাথে মুসলিম সমাজে ও মুসলিম পরিবারে কিছু পরিবর্তন দেখা যায়।

  • -দেখা যায় মসজিদের কাতারে নামাযীর আধিক্য।
  • -আযানের সাথে সাথে বেশ কিছু লোকের মসজিদে আগমন।
  • -এবং তারাবীহর নামায আদায়ের জন্য ছোট-বড় অনেক লোকের মসজিদে অপেক্ষা।
  • দেখা যায় কিছু লোকের পরিধানে পরিবর্তন।
  • -সুন্দর পাঞ্জাবী ও টুপি, যা তারা অন্য দিনে খুব কমই গায়ে দেয় কিন্তু এই মাসে প্রায় সময় তাদের শরীরে এই রকম লেবাস সজ্জা পায়।

দেখা যায় বিনোদনে পরিবর্তন।

  • -যারা অন্য দিনে আশঙ্কামুক্ত হয়ে টেলিভিশন, নেট, ফেসবুক ও মোবাইলে গান-বাজনা সহ অন্যান্য হারাম বিনোদনে লিপ্ত থাকতো, তারা অনেকে এই মাসে অনেকটা সংযত হয়ে যায়।
  • -অনেকে টেলিভিশনের ক্যাবেল সংযোগ কেটে দেয়, মোবাইলের রিং টোন পাল্টে দেয় এবং এই রকম আরো অন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

দেখা যায় বাড়ির ভিতরের পরিবেশে পরিবর্তন।

  • অনেকের বাড়ির ভিতর থেকে ভেসে আসতে শুরু করে কুরআন তেলাওয়াতের সুর।
  • মহিলারা মাথায় ঘোমটা টেনে গুণ গুণ সুরে পড়তে থাকে কুরআন মজীদ।
  • অনেকের টেপ রেকোর্ডার ও ডি.ভি.ডি. প্লেয়ারে গানের বদলে বাজতে লাগে কারী সাহেবের তিলাওয়াত নচেৎ গজল ও ইসলামী সঙ্গীত।

দেখা যায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর সাধুত্ব।

  • অন্য দিনে যারা দুধে পানি মিশ্রণ করে বিক্রি করত, কলাই, গম এবং সরিষায় পাথরের কুচি মিশ্রণ করে মালের ওজন বৃদ্ধি করত, মুদিখানার বিভিন্ন সামগ্রীতে বিভিন্ন কিছু মিক্চার করে বিনা দ্বিধায় গ্রাহকের হাতে তুলে দিত, তারা অনেকে এই মাসে এইসব অসাধু কাজে লাগাম দিয়ে এক মাসের জন্য সাধু ব্যবসায়ী হওয়ার চেষ্টা করে।

দেখা যায় বদান্যতা। অনেক মুসলিম ভাইর হাত এই মাসে প্রশস্ত হয়ে যায়।

  • তাই কেউ কাপড়-চপড় বিতরণ করে,
  • কেউ মসজিদ মাদ্রাসায় দান-খয়রাত করে
  • এবং কেউ যাকাত বের করে। যার ফলে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে চাঁদা আদায়কারীর সংখ্যাও বেড়ে যায়।

দেখা যায় ধুমপায়ী ও নেশাখোর ব্যক্তিদের সংযত হতে।

  • তাই দিনের বেলায় তাদের বিড়ি-সিগারেট টানতে দেখা যায় না,
  • হাতে খয়নি ডলে তাতে ফুৎকার দিতে দেখা যায় না।
  • এমনকি পানের দোকানে পান খেতে ও গুটকার পুরিয়া মুখে পুরতে দেখা যায় না।
  • প্রায় প্রত্যেক পান, বিড়ি, সিগারেট ও গুটকার দোকানের ব্যবসা মন্দা হয়ে পড়ে। তবে সূর্য্য ডুবলে তাদের ব্যবসা আবার অনেকটাই জমে উঠে।

আর একটি বিষয় দেখা যায়, যা উল্লেখ না করলে এই অবস্থা বর্ণনার ইতি করা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। তা হলো, দেশের সম্প্রচার মাধ্যমের সিডিউলে পরিবর্তন।

  • রামাযান আসতেই টেলিভিশন ও রেডিওতে রবীন্দ্রসঙ্গীত, পল্লীগীতি, ও লোকগীতির স্থানে শুরু হয় ইসলামী সঙ্গীত ও ইসলামী নজরুলগীতি।
  • মাঝে মাঝে কুরআন মজীদের অর্থ সহ তিলাওয়াত।
  • সাহরী অনুষ্ঠান সহ ইফতারী অনুষ্ঠান।
  • এছাড়া দৃষ্টি তখন ধোকা খায় যখন টেলিভিশনে মহিলা খবর পড়ুয়াদের দেখা যায়, তারা তাদের ১১ মাসের চিরাচরিত সাজ-সজ্জ্যা মলিন করে মাথায় কাপড় দিয়ে খবর পড়ে!

অতঃপর দীর্ঘ ৩০ দিনের এই আল্লাহ ভীরুতা, ঈমানী চেতনা, রামাযানী সভ্যতা, দ্বীনী অনুপ্রেরণা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং সুন্দর ইসলামী পরিবেশ মুখ থুবড়ে পড়ে, যখন পশ্চিম দিগন্তে ঈদের হেলাল উঁকি দেয়। ঈদের এই চাঁদ উঠার মাত্র এক ঘন্টার মধ্যে সেই মুসলিম সমাজে দেখা দেয় এর বিপরীত করুণ পরিবর্তন। আপনি আপনার মসজিদে মাগরিবের নামায পড়ে ঈদের সুসংবাদ নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন মাত্র। আর এর এক-দেড় ঘন্টা পর যখন ইশার নামাযে সেই মসজিদে যাবেন, তখন দেখেবেন মসজিদ খালি, ৫/৭টি কাতারের মধ্যে প্রথম লাইনও ভর্তি হয়নি, মসজিদের খাদেম পিছনের লাইনগুলির জায়নামায জোড়াতে ব্যস্ত।
বাড়ি ফিরেই সেই রেডিও টেলিভিশনগুলিতে দেখবেন ডিং ডাং শুরু হয়ে গেছে। খবর পড়ুয়াদের মাথা থেকে ঘোমটা সরে গেছে, চলছে বাজনা সহকারে ‘রামযানের ঐ রোযার শেষে এলো খুশীর ইদ’। ধুমপায়ী ও নেশাখোররা সানন্দে সস্থির নিঃশ্বাস ছেড়ে বিড়ি-সিগারেট টানছে ও নেশা করছে আর মনে মনে বলছেঃ বাঁচলাম! বিড়ি-তামাক না খেলে ভাত হজম হয় কি! অথচ একমাস যাবৎ তাদের বদ হজম হয়নি। সত্যিকারে রামাযান মাসে এই রকম লোকের চেহারা ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়, তাদের চেহারায় একটি জ্যোতি প্রকাশ পায় কিন্তু তারা এই মূল্যবান জ্যেতির হেফাজত না করে আবার অন্ধকারের মরিচা লাগাতে থাকে। বাড়িতে কুরআন তেলাওয়াতের শব্দ আর শোনা যায় না বরং অনেকে তা কাপড়ের গেলাফে জোড়িয়ে আলমারীতে রেখে দেয়। ইসলামী পোষাক আর গায়ে থাকে না, টুপি আর মাথায় শোভা পায় না। এই ভাবে বাকি অন্যান্য ভাল স্বভাবগুলি পুনরায় কুস্বভাবে পরিবর্তন হওয়ার অনুমান করা যেতে পারে।
এছাড়া কিছু মডার্ন নামের মুসলিম পরিবার এমনও আছে যারা, রোযা-নামাযের তেমন ধার ধারে না তবে ঈদ পালনে পাকা মুসলমান। তারা ঈদের দিনটিকে উপভোগ করার উদ্দেশ্যে সেই রাতেই রুটিন তৈরি করে। কি ভাবে ও কতপ্রকার আনন্দ-বিনোদনে ঈদ কাটাতে হবে? তার পুরো সেটিং করে নেওয়া হয়। পরের দিন রুটিন মত শুরু হয়, পরিবার সহ সিনেমা দর্শন, গান-বাজনার আয়োজন, বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ডের সাথে সাক্ষাৎ ও গিফ্ট আদান-প্রদান, মদ পানের পার্টি ইত্যদি।
এই ভাবে আমরা অনেকে রোযা পালন করি, ঈদ উদযাপন করি কিন্তু আবার পূর্বের জীবন-যাত্রায় ফিরে আসি। রোযা তথা রামাযান আমাদের জীবনে কোন পরিবর্তন আনে না, কোন প্রকার প্রভাব ফেলে না। কারণ কি?

  • ১-আসলে স্বয়ং আমরাই পরিবর্তন চাই না। আমরাই আমাদের জীবনের দ্বীনী পরিবর্তনে অনিচ্ছুক। না হলে ভেবে দেখুন, রোযার মাসে কিন্তু আপামর জীবনে অনেক পরিবর্তন ছিল বা হয়েছিল কিন্তু সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা আমরাই পরে রক্ষা করি না। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ

(إن اللهَ لا يغيّرُ ما بقومِ حتّى يُغيّروا ما بأنفسهم) الرعد/11

“আল্লাহ কোন সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না যতক্ষণ না তারা নিজেরাই তাদের অবস্থা পরিবর্তন করে।” [সূরা রাআ’দ/১১]

  • ২- এই প্রকার রোযাদাররা তাদের সাউম পালনে আন্তরিক নয়। তাই যখন রোযার মাস আসে, তখন শুরুতেই তারা ভেবে নেয় যে, এটা রোযার মাস তাই একটু ভাল হয়ে থাকতে হবে, কিছুটা সংযত হতে হবে। অতঃপর রোযা শেষ হলে পূর্বে যেমন ছিলাম তেমনই থাকবো। বুঝা গেল, তারা রোযা পালনে আন্তরিক নয়, খাঁটি নয়; কারণ সে এই মাসের পর পুনরায় মন্দের দিকে ফিরে যাওয়ার গোপন ইচ্ছা রাখে। বলুনতো, আল্লাহ কি আমাদের এই গোপন নিয়তটির খবর রাখেন না? মনে রাখতে হবে, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আন্তরিক ও খাঁটি ভাবে ইবাদত না করলে তা আল্লাহর নিকট গ্রহণ হয় না। মহান আল্লাহ বলেনঃ

(وَ ما أمِروا إلا ليعبدوا اللهَ مُخْلصينَ له الدّينَ حُنفآءَ) البينة/5

“তাদের এ ছাড়া অন্য কোন আদেশ দেয়া হয়নি যে, তারা আল্লাহর ইবাদত করবে খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমে।” [সূরা বাইয়্যিনাহ/৫]

  • ৩- আসলে সমাজের অনেকাংশে রোযা এখন ইবাদত হিসাবে নয় বরং ‘আদত’ হিসাবে পালিত হচ্ছে। অর্থাৎ, ১ মাস রোযা পালন যে আল্লাহ আমাদের প্রতি ফরয করেছেন, এটি যে আল্লাহ প্রদত্ত একটি ফরয ইবাদত, এটা যে তাঁরই সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করতে হবে, কেবল সওয়াব অর্জনের উদ্দেশ্যেই হতে হবে, এমন উদ্দেশ্যে তা সম্পাদন না করে সমাজের আচার রক্ষার্থে বা সমাজের লোকের দেখা-দেখি পালন করা হচ্ছে। অনেকে মনে করছে, রোযা না রাখলে গ্রামের বা সমাজের লোকেরা কি বলবে!? অনেকে নেকীর উদ্দেশ্যে কম আর পার্থিব লাভের আশায় বেশী পালন করে। বলেঃ রোযা রাখলে শরীরের ওজন কম হবে, শুগার কন্ট্রোলে থাকবে, ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণে থাকবে ইত্যাদি। অথচ রোযা তখন ক্ষমার মাধ্যম হয়, যখন রোযাদার কেবল ঈমান ও সওয়াব অর্জনের আশায় তা সম্পাদন করে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ

” من صام رمضان إيمانا و احتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه” رواه البخاري، رقم 1901

“যে ব্যক্তি ঈমান ও নেকীর আশায় (আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে) রামাযান মাসের রোযা পালন করবে, তার বিগত সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করা হবে”। [বুখারী, নং১৯০১]

  • ৪- আমরা রোযাদার কিন্তু রোযার রহস্য ও মর্মাথ বুঝি না। আমরা এক মাস পানাহার থেকে বিরত থাকাকেই রোযার উদ্দেশ্য মনে করি। কিন্তু চিন্তা করার প্রয়োজন আছে যে, এই এক মাসের ইবাদত, সংযম ও পরহেযগারীতা আমাদের মানসিক ভাবে প্রস্তুত করে না কি যে, আমরা আগামী এক বছর তথা ভবিষ্যতে ধারাবাহিক সংযমে অভ্যস্ত হব। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা ও তার উপর অটল থাকা হতে বিরত থাকে না, আল্লাহর নিকট এইরকম লোকের পানাহার করা না করার কোনো প্রয়োজন নেই”। [বুখারী, অধ্যায়, সাউম, নং ১৯০৩]

হে রোযাদার মুসলিম ভাই! মনে রাখবেন, যিনি রামাযান মাসে আল্লাহ তিনি অন্য মাসেও মহান আল্লাহ। যিনি রামাযান মাসে সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা, তিনি অন্য মাসেও সেই গুণের অধিকারী। যিনি রোযার মাসে মাবুদ, তিনি অন্যান্য সময়েও উপাস্য। আর আমরা তাঁর গোলাম বা দাস। সবসময় ধারাবাহিক দাসত্ব করাই এক বান্দার মূল কর্তব্য।

মহান আল্লাহ বলেনঃ

  • “তুমি তোমার প্রভুর ইবাদত করো যতক্ষণে মৃত্যু না আসে।) [সূরা হিজর/৯৯]
  • আয়েশা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “তোমরা জেনে রেখো অবশ্যই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে পছন্দনীয় আমল হচ্ছে, ধারাবাহিক আমল যদিও তা অল্প হয়”। [মুসলিম, অধ্যায়, মুনাফেকদের স্বভাব ও তাদের বিধান, নং ৭৩০০]
  • একাধিক সালাফ হতে প্রমাণিত, তারা বলতেনঃ ‘কত নিকৃষ্ট সেই সম্প্রদায়, যারা রামাযান মাস ছাড়া অন্য সময়ে আল্লাহকে চিনে না’।

হে রোযার মাসে সংযমী ভাই! যদি আপনি আল্লাহর উদ্দেশ্যে ১২-১৪ ঘন্টা পানাহার ও অশ্লীলতা থেকে সংযমী হতে পারেন, তো ১২ মাসেও সংযম থাকার ক্ষমতা রাখেন। যদি ১২-১৩ ঘন্টা ধূমপান তথা অন্যান্য নেশা ত্যাগ করতে পারেন, তো ১২ মাস তথা ১২ বছরও তা পারেন। রোযার মাসে যদি হারাম ব্যবসা ত্যাগ করতে পারেন তো অন্য মাসেও তা পারেন। রামাযান মাসে যদি নিয়মিত কুরআন পড়তে পারেন, তো অন্য মাসেও তা পারেন। এই মাসে যদি ফজরের নামায জামাআ’তে আদায় করতে পারেন, তো অন্য মাসেও তা সম্ভব। এই মাসে যদি নফল নামায ও দান-খয়রাত করতে সক্ষম হোন, তো অন্য মাসেও তা সম্পাদন করতে সক্ষম হবেন।

তবে প্রয়োজন আছেঃ-

  • প্রয়োজন আছে দৃঢ় সংকল্পের; কারণ সত্য সংকল্প, অসাধ্যকে সাধ্য করে, কঠিনকে সহজ করে এবং ইচ্ছা পূরণে সাহায্য করে। তার সাথে দরকার আছে স্থিরতা ও ধৈর্যের। ইবনুল ক্বাইয়্যূম (রহ) বলেনঃ “মানুষ দৃঢ় সংকল্প ও স্থায়িত্বের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করে। যার সংকল্প নেই সে অসম্পূর্ণ। আর যার সংকল্প আছে কিন্তু তার প্রতি তার স্থায়িত্ব নেই, সেও অসম্পূর্ণ। অতঃপর যখন সংকল্পের সাথে স্থায়িত্বের সংযোগ হয়, তখন পূর্ণতা লাভ হয়। এই কারণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দুআ’য় উল্লেখ হয়েছে, যা ইমাম আহমদ ও ইবনু হিব্বান তাঁর সহীহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন “হে আল্লাহ! আমি প্রত্যেক বিষয়ে স্থায়িত্ব এবং সততার দৃঢ়তা প্রার্থনা করছি”। আর একথা সর্বজন বিদিত যে, ধৈর্যের মেরুদণ্ড ছাড়া স্থায়িত্ব ও সংকল্পের বৃক্ষ দণ্ডয়মান হয় না”। [ত্বরীকুল হিজরাতাঈন, ১/৪০১]

প্রয়োজন আছে রাঙ্গা চোখে, অভিশপ্ত শয়তানকে স্পষ্ট জানিয়ে দিতে যে, রামাযান মাসে যেমন আমি তোমার অনুসরণ করি নি, তোমার বন্ধু হয়নি, তোমার সুরে সুর মিলায় নি, তেমন অন্য মাসেও তোমার ধার ধারি না, তোমার সামান্যতমও সঙ্গ দিতে পারি না কারণ; তুমি আমার স্পষ্ট দুশমন। সত্যিকারে এই মরদূদ শয়তান রামাযান শেষে শিকল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর যখন দেখে তার সঙ্গী-সাথী অনেক কমে গেছে, তখন সে মরিয়া হয়ে আবার তাদের নিজ দলে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চালায়। আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ

(إنّ الشيطانَ لكم عدوٌ فاتّخذهُ عدوّاً، إنما يدعواْ حزبهُ ليكونوا من أصحابِ السعير) [الفاطر/6]

“শয়তার তোমাদের শত্রু। কাজেই তাকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ কর। সে কেবল তার দলবলকে ডাকে, যাতে তারা জ্বলন্ত অগ্নির সঙ্গী হয়।” [সূরা ফাতির/৬]

  • আর এ সবের পূর্বে অবশ্যই প্রয়োজন আছে মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনার, যেন তিনি আমাদের দ্বীনে অবিচল রাখেন, সৎ কাজে ধারাবাহিকতা প্রদান করেন এবং তা কবূল করেন। কারণ তিনিই সঠিক পথ প্রদর্শক, বান্দার আমল কবূল কারী ও তাওফীক দাতা। আল্লাহ বলেনঃ (আর তাঁকে ভয়-ভীতি ও আশা-ভরসা নিয়ে ডাকতে থাক, আল্লাহর দয়া তো তাদের নিকটে যারা সৎ কাজ করে।) [আ’রাফ/৫৬] আল্লাহুল মুওয়াফফিক ওয়াল মুস্তাআ’ন। 

লেখক: আব্দুর রকীব, মাদানী
দাঈ, দাওয়া’হ সেন্টার, খাফজী, সউদী আরব।

 

2 thoughts on “ফিরে এলো রামাযান…. কিন্তু মুসলিম জীবনে ঈমানী পরিবর্তন কবে?

  1. প্রসঙ্গ :
    সারা বিশ্বে একই
    দিনে ছিয়াম ও ঈদ
    মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলাম
    লিসান্স,
    মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়,
    সঊদী আরব।
    আহমাদ আব্দুল্লাহ ছাকিব
    পিএইচ.ডি গবেষক,
    রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
    সারা বিশ্বে একই দিনে ছিয়াম ও ঈদ
    পালন নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের
    বিভিন্ন স্থানে একশ্রেণীর মানুষের
    মধ্যে ব্যাপক তোলপাড় লক্ষ্য
    করা যাচ্ছে। ইতিপূর্বে ১৯৮৬ সালের
    ১১-১৬ অক্টোবর ওআইসির অঙ্গ সংগঠন
    ‘ইসলামী ফিকহ একাডেমী’ জর্ডানের
    রাজধানী আম্মানে এ
    ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেও
    এখনও পর্যন্ত ওআইসি কার্যকরী কোন
    পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি। কারণ এ
    বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি ছিল কেবলই
    যুক্তিনির্ভর; শরী‘আত
    কিংবা বাস্তবতার নিরিখে এর কোন
    ভিত্তি নেই। তবুও সাধারণ মানুষের
    মধ্যে যেহেতু এ নিয়ে গুঞ্জরণ
    সৃষ্টি হয়েছে, তাই শারঈ দৃষ্টিকোণ
    এবং বাস্তবতার
    নিরিখে বিষয়টি বিশ্লেষণ
    করা প্রয়োজন।
    মূলতঃ শারঈ দৃষ্টিকোণ
    থেকে যদি আমরা লক্ষ্য
    করি তাহলে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে,
    কুরআন ও হাদীছে মাস গণনার জন্য চাঁদ
    দেখার
    যে নির্দেশনা এসেছে তা স্থানিক
    তথা একটি নির্দিষ্ট জনসমষ্টির জন্য
    প্রযোজ্য, যাদের উপর চন্দ্র উদিত
    হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
    ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস
    (রামাযান) পাবে, সে যেন ছিয়াম
    রাখে’ (বাকারাহ ২/১৮৫) । রাসূলুল্লাহ
    (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা চাঁদ
    দেখে ছিয়াম রাখ এবং চাঁদ
    দেখে ছিয়াম ভঙ্গ কর’ (বুখারী, মুসলিম,
    মিশকাত হা/১৯৭০) ।
    যদি হাদীছে বর্ণিত এই
    নির্দেশটি স্থানিক না হয়ে সমগ্র
    বিশ্বের জন্য প্রযোজ্য হ’ত,
    তাহ’লে চাঁদের সর্বপশ্চিমের উদয়স্থল
    তথা বর্তমান
    আমেরিকা মহাদেশকে অথবা পৃথিবীর
    মধ্যস্থল
    হিসাবে সঊদীআরবকে শরী‘আতে মানদন্ড
    হিসাবে গ্রহণ করা হ’ত
    এবং সেখানে চাঁদ দেখা মাত্রই সমগ্র
    বিশ্বে একই সাথে ছিয়াম ও ঈদ
    পালনের জন্য নির্দেশ দেয়া হত। কিন্তু
    কুরআন ও হাদীছের কোথাও এর প্রমাণ
    পাওয়া যায় না।
    বরং তাৎপর্যপূর্ণভাবে কুরআনের
    ভাষাটি এসেছে এভাবে যে,
    ‘যারা এ মাস পাবে’ অর্থাৎ সকলেই নয়,
    বরং তারাই যারা চাঁদ
    দেখতে পাবে (হাদীছের
    ব্যাখ্যা থেকে যা আরো সুস্পষ্ট হয়)।
    অতএব রামাযানে ছিয়াম রাখা ও
    রামাযান শেষে ঈদ পালন করার
    সাথে ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টির চাঁদ
    দেখা শর্ত। এটাই আরবী মাস
    বা চন্দ্রমাস নির্ণয়ের চিরাচরিত ও
    স্বতঃসিদ্ধ পদ্ধতি। আধুনিক
    যুগে স্যাটেলাইট আবিষ্কারের
    পূর্বে এ নিয়ে কখনও সেভাবে প্রশ্ন
    উঠেনি। মূলতঃ চন্দ্র ও সূর্য একই
    নিয়মে পৃথিবীর
    চতুর্পার্শ্বে ঘূর্ণায়মান। চন্দ্র হ’ল
    মাসের
    সময় নির্ধারক, আর সূর্য হল দিনের সময়
    নির্ধারক। কোন স্থানে সূর্য উদয়ের
    সাথে সাথে যেমন দিনের শুরু হয়,
    তেমনি অমাবস্যার পর চন্দ্র উদয়ের
    সাথে সাথে মাসের শুরু হয়। এটাই
    স্বতঃসিদ্ধ প্রাকৃতিক রীতি। এভাবেই
    চন্দ্র ও সূর্য প্রকৃতির অমোঘ
    নিয়মে একে অপরের সাথে
    অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।
    এক্ষণে ছিয়াম ও ঈদ পালনে এই
    প্রাকৃতিক চক্রকে (Natural cycle)
    অস্বীকার করা যেমন অবৈজ্ঞানিক,
    তেমনই অজ্ঞতার পরিচায়ক। নিম্নে এ
    বিষয়ে ভিন্নমত পোষণকারীদের কিছু
    প্রমাণ ও যুক্তি খন্ডন করা হ’ল-
    (১) যারা বর্তমানে একই দিনে ছিয়াম
    ও ঈদ পালনের দাবী তুলেছেন
    তারা একটি হাদীছ প্রমাণ
    হিসাবে পেশ করতে চান যে, দু’জন
    ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি চাঁদ দেখার
    সাক্ষী দিলে রাসূল (ছাঃ) ছিয়াম
    পালন ও তা ভঙ্গ করার নির্দেশ
    দিয়েছেন।[1] অতএব আধুনিক মিডিয়ার
    মাধ্যমে বিশ্বের কোন স্থানে চাঁদ
    দেখার খবর পেলেই তা সমগ্র বিশ্বের
    জন্য প্রযোজ্য হবে। এক্ষণে উক্ত সাক্ষ্য
    দুনিয়ার সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য
    হবে কি-না? এ ব্যাপারে মানুষের
    মস্তিষ্কপ্রসূত যুক্তিকে পদদলিত
    করে ছাহাবায়ে কেরামের
    আমলকে অগ্রাধিকার দেয়াই যথার্থ
    হবে। কুরাইব (রাঃ) বর্ণিত
    আছারে এসেছে যে,
    তিনি সিরিয়ায় রামাযানের ছিয়াম
    রেখে মাস শেষে মদীনায়
    ফিরে এখানকার ছিয়ামের সাথে এক
    দিন কমবেশ দেখতে পান। এ বিষয়ে ইবনু
    আববাস (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস
    করা হ’লে তিনি বলেন যে, সিরিয়ার
    আমীর মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর গৃহীত
    ছিয়ামের তারিখ মদীনায় প্রযোজ্য
    নয়। কেননা ওখানে তোমরা শুক্রবার
    সন্ধ্যায় চাঁদ দেখেছ। অতএব
    আমরা ছিয়াম চালিয়ে যাব, যতক্ষণ
    না ঈদের চাঁদ দেখতে পাব’। অন্য
    বর্ণনায় এসেছে, আমরা ৩০ দিন পূর্ণ করব।
    তাঁকে বলা হ’ল: মু‘আবিয়ার চাঁদ
    দেখা ও ছিয়াম রাখা কি আপনার জন্য
    যথেষ্ট নয়? তিনি বললেন, না। এভাবেই
    রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)
    আমাদেরকে নির্দেশ দান করেছেন।[2]
    ইমাম নববী বলেন, এ হাদীছ
    স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, এক শহরের
    চন্দ্র দর্শন অন্য শহরে প্রযোজ্য নয় অধিক
    দূরত্বের কারণে।[3]
    উল্লেখ্য যে,
    সিরিয়া মদীনা থেকে উত্তর-
    পশ্চিমে এক মাসের পথ এবং প্রায় ৭০০
    মাইল দুরত্বে অবস্থিত। সময়ের পার্থক্য
    ১৪ মিনিট ৪০ সেকেন্ড।
    সম্ভবতঃ সে কারণেই
    সেখানে মদীনার একদিন পূর্বে চাঁদ
    দেখা গিয়েছিল। মিশকাতের
    ভাষ্যকার ওবায়দুল্লাহ
    মুবারকপুরী (১৩২২-১৪১৪ হিঃ/ ১৯০৪-১৯৯৪
    খৃঃ) বলেন, ‘পশ্চিম দিগন্তে ভূপৃষ্ঠ
    থেকে নবচন্দ্রের উদয়কালের উচ্চতার
    আধুনিক হিসাব মতে পশ্চিম
    অঞ্চলে চাঁদ
    দেখা গেলে পশ্চিমাঞ্চলসহ সেখান
    থেকে অন্যূন ৫৬০ মাইল
    দূরত্বে পূর্বাঞ্চলের অধিবাসীদের
    জন্য ঐ চাঁদ গণ্য হবে। আর
    যদি পূর্বাঞ্চলে চাঁদ দেখা যায়,
    তাহ’লে পশ্চিমাঞ্চলের অনুরূপ দূরত্বের
    অধিবাসীদের জন্য উক্ত চাঁদ গণ্য হবে’।
    [4] সর্বাধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের
    উক্ত হিসাব মতে মক্কা শরীফে চাঁদ
    দেখা অঞ্চলের দেশসমূহের ৫৬০ মাইল
    পর্যন্ত উক্ত চাঁদ দেখা যাওয়া সম্ভব
    এবং উক্ত দূরত্বের অধিবাসীগণ উক্ত
    চাঁদের হিসাবে ছিয়াম ও ঈদ পালন
    করতে পারেন। উল্লেখ্য যে, এই
    মাইলের হিসাব সরাসরি আকাশ পথের
    মাইল, সড়ক পথের মাইল নয়।
    অতএব বুঝা গেল, দু’জন মুসলিমের সাক্ষ্য
    ঐ অঞ্চলের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ
    যে অঞ্চলে একই দিনে চাঁদ
    দেখা সম্ভব। যারা উক্ত ছহীহ
    আছারকে উপেক্ষা করে দু’জন মুসলিমের
    সাক্ষীকে দুনিয়ার সকল মানুষের জন্য
    প্রযোজ্য মনে করেন, তাদের
    উদ্দেশ্যে বলব, সঊদী আরবের পশ্চিমেও
    তো অনেক দেশ রয়েছে,
    যে দেশগুলোতে সঊদী আরবের
    পূর্বে চাঁদ দেখা যায়। যেমন এ বছর
    (২০১৩ইং) উত্তর আমেরিকাতে ৮ জুলাই
    দিবাগত রাতে চাঁদ
    দেখা গেছে এবং ৯ জুলাই (মঙ্গলবার)
    প্রথম ছিয়াম পালিত হয়েছে।
    তাহ’লে সঊদী আরবকে কেন
    আপনারা মানদন্ড হিসাবে গণ্য করছেন?
    চাঁদ তো পশ্চিমে সর্বপ্রথম উদিত হয়
    আমেরিকা মহাদেশে? আপনাদের এই
    দ্বিমুখী নীতিই কি আপনাদের দাবীর
    অসারতা প্রমাণে যথেষ্ট নয়?
    (২) ‘রাসূল (ছাঃ)-এর আমল’ শিরোনাম
    দিয়ে কয়েকটি হাদীছ উপস্থাপন
    করা হয়ে থাকে যে, রাসূল (ছাঃ)
    মধ্যাহ্নের পর কয়েকজন
    মরুবাসী বেদুঈনের কাছে শাওয়ালের
    চাঁদ দেখার সংবাদ পেলেন
    এবং তৎক্ষণাৎ ছাহাবীদেরকে ছিয়াম
    ভঙ্গ করতে বললেন ও পরদিন ঈদের
    ছালাত আদায়ের নির্দেশ দিলেন।[5]
    কিন্তু এই
    হাদীছগুলিতে সারাবিশ্বে একদিনে
    ছিয়াম
    ও ঈদ পালনের পক্ষে দলীল গ্রহণের
    সুযোগ কোথায়? কেননা রাসূল (ছাঃ)
    যাদের কাছে সংবাদ পেয়েছিলেন
    তারা দূরবর্তী কোন স্থান থেকে আগমন
    করে নি; বরং মদীনা বা মদীনার
    পার্শ্ববর্তী কোন স্থান থেকেই
    এসেছিল। কেননা মাত্র একদিনের
    ব্যবধানে কোন ব্যক্তি বা কাফেলার
    জন্য খুব বেশী দূরত্ব থেকে আগমন
    করা সম্ভব ছিল না। অতএব এই
    হাদীছগুলির বাস্তবতা এটাই যে,
    মদীনার লোকালয়ে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন
    থাকার কারণে রাসূল (ছাঃ) ও
    ছাহাবীরা চাঁদ দেখতে পাননি।
    কিন্তু পার্শ্ববর্তী মরুভূমির মানুষ আকাশ
    পরিষ্কার থাকায়
    তা দেখতে পেয়েছিল। তাই তাদের
    সংবাদ রাসূল (ছাঃ)
    আমলে নিয়েছিলেন এবং ছিয়াম ভঙ্গ
    করেছিলেন। এ বিষয়টি ইবনে মাজাহর
    হাদীছেও স্পষ্টভাবে এসেছে। যেমন
    আনাস বিন মালেক (রাঃ) তাঁর
    আনসারী ছাহাবী চাচাদের উদ্ধৃত
    করে বর্ণনা করেছেন যে, ﺃُﻏْﻤِﻲَ ﻋَﻠَﻴْﻨَﺎ ﻫِﻼَﻝُ
    ﺷَﻮَّﺍﻝٍ ﻓَﺄَﺻْﺒَﺤْﻨَﺎ ﺻِﻴَﺎﻣًﺎ ﻓَﺠَﺎﺀَ ﺭَﻛْﺐٌ অর্থাৎ আকাশ
    মেঘাচ্ছন্ন থাকায় চাঁদ আমাদের
    কাছে অস্পষ্ট ছিল। তাই আমরা ছিয়াম
    রেখেছিলাম। অতঃপর
    একটি কাফেলা আগমন করল…।[6]
    সুতরাং রাসূল (ছাঃ)-এর এই আমল একই
    দিনে ছিয়াম ও ঈদ পালনের
    পক্ষে কোনই প্রমাণ বহন করে না।
    (৩) ছিয়াম ফরযের আয়াতটি বর্ণনার পরই
    আল্লাহ যেমন বলেছেন, ﻓَﻤَﻦْ ﺷَﻬِﺪَ ﻣِﻨْﻜُﻢُ ﺍﻟﺸَّﻬْﺮَ
    ﻓَﻠْﻴَﺼُﻤْﻪُ ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ
    মাস (রামাযান) পাবে, সে যেন
    ছিয়াম রাখে’ (বাকারাহ ২/১৮৫) ।
    তেমনিভাবে দু’টি আয়াত পরেই
    বলেছেন, ﻭَﻛُﻠُﻮﺍ ﻭَﺍﺷْﺮَﺑُﻮﺍ ﺣَﺘَّﻰ ﻳَﺘَﺒَﻴَّﻦَ ﻟَﻜُﻢُ ﺍﻟْﺨَﻴْﻂُ
    ﺍﻟْﺄَﺑْﻴَﺾُ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﺨَﻴْﻂِ ﺍﻟْﺄَﺳْﻮَﺩِ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻔَﺠْﺮِ ﺛُﻢَّ ﺃَﺗِﻤُّﻮﺍ ﺍﻟﺼِّﻴَﺎﻡَ
    ﺇِﻟَﻰ ﺍﻟﻠَّﻴْﻞِ ‘তোমরা পানাহার কর যতক্ষণ
    রাত্রির কৃষ্ণরেখা হতে উষার শুভ্র
    রেখা প্রতিভাত না হয়। অতঃপর
    তোমরা রাত্রি পর্যন্ত ছিয়াম পূর্ণ কর’
    (বাকারাহ ২/১৮৭) । উপরোক্ত
    আয়াতদ্বয়ের প্রথম আয়াতটি চন্দ্রের
    সাথে সম্পৃক্ত, আর পরেরটি সূর্যের
    সাথে। এক্ষণে প্রথমটি অনুসরণ
    করা হবে আন্তর্জাতিক সময় অনুযায়ী,
    আর পরেরটি অনুসরণ করা হবে স্থানীয়
    সময় মোতাবেক, এটা কি স্পষ্টতই
    দ্বিমুখিতা নয়?
    (৪) এ বিষয়ে আরো যুক্তি দাঁড়
    করানো হয় যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)
    রামাযানের শেষ দশকের বিজোড়
    রাত্রিতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান
    করতে বলেছেন। অতএব একই
    দিনে ছিয়াম আরম্ভ
    না করলে দেখা যাবে, যেদিন
    সঊদী আরবে বেজোড় রাত, সেদিন
    বাংলাদেশে জোড় রাত।
    এক্ষণে লাইলাতুল কদর কোন দেশের
    বেজোড় রাত অনুযায়ী হবে?
    উত্তরে বলব, হে বিবেকবান মুসলিম
    ভাই! যদি আপনার
    যুক্তি মেনে নেয়া হয়,
    তাহ’লে আমরা যখন সঊদী আরবের
    অনুসরণে লাইলাতুল কদর পালন করব, তখন
    কিছু দেশে যেমন রাত থাকবে, তেমন
    কিছু দেশে দিনও থাকবে।
    তাহ’লে কি তারা সে সময় লাইলাতুল
    কদর (কদরের রাত) পালন
    না করে নাহারুল কদর (কদরের দিন)
    পালন করবে? বেজোড়
    রাত্রিতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান
    সম্পর্কিত হাদীছটির
    ব্যাখ্যা যদি এভাবেই করা হয়,
    তাহলে এই হাদীছের
    ব্যাখ্যা কি হবে?
    যেখানে বলা হয়েছে, ﻳَﻨْﺰِﻝُ ﺭَﺑُّﻨَﺎ ﺗَﺒَﺎﺭَﻙَ
    ﻭَﺗَﻌَﺎﻟَﻰ ﻛُﻞَّ ﻟَﻴْﻠَﺔٍ ﺇِﻟَﻰ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﺀِ ﺍﻟﺪُّﻧْﻴَﺎ ﺣِﻴﻦَ ﻳَﺒْﻘَﻰ ﺛُﻠُﺚُ ﺍﻟﻠَّﻴْﻞِ
    ﺍﻵﺧِﺮُ ﻳَﻘُﻮﻝُ ﻣَﻦْ ﻳَﺪْﻋُﻮﻧِﻰ ﻓَﺄَﺳْﺘَﺠِﻴﺐَ ﻟَﻪُ ﻣَﻦْ ﻳَﺴْﺄَﻟُﻨِﻰ
    ﻓَﺄُﻋْﻄِﻴَﻪُ ﻣَﻦْ ﻳَﺴْﺘَﻐْﻔِﺮُﻧِﻰ ﻓَﺄَﻏْﻔِﺮَ ﻟَﻪُ ‘আল্লাহ
    প্রতি রাতের তৃতীয় প্রহরে নিম্ন
    আকাশে অবতরণ করেন এবং ফজর পর্যন্ত
    বান্দাদের প্রতি আহবান
    জানিয়ে বলেন, আছ কি কোন
    আহবানকারী, আমি তার
    আহবানে সাড়া দেব। আছ কি কেউ
    সাহায্য প্রার্থনাকারী,
    আমি তাকে তা দিব। আছ কি কেউ
    ক্ষমা প্রার্থনাকারী,
    আমি তাকে ক্ষমা করব’।[7]
    কেননা বিশ্বপরিমন্ডলের ভৌগলিক
    অবস্থান লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ২৪
    ঘণ্টার প্রতিটি মুহূর্তেই কোন না কোন
    দেশে শেষ রাত্রি উপস্থিত হচ্ছে।
    তার অর্থ কি এই যে আল্লাহ সর্বদাই
    দুনিয়ার আসমানে অবস্থান করছেন?
    বর্তমানে লাইলাতুল কদরের
    ব্যাখ্যা যেভাবে করা হচ্ছে, অত্র
    হাদীছের অনুরূপ ব্যাখ্যা দাঁড়
    করালে আল্লাহ তা‘আলার জন্য
    সর্বদা দুনিয়াবী আসমানে অবস্থান
    করাই কি অপরিহার্য হয়ে যায় না?
    (নাউযুবিল্লাহি) মূলতঃ আল্লাহ
    তা‘আলা দিন-রাত্রির
    দুনিয়াবী হিসাবের ঊর্ধ্বে। তাই
    হাদীছটির বাস্তবতা সম্পর্কে একমাত্র
    তিনিই জানেন। এ নিয়ে প্রশ্ন
    তোলা শুধুই মূর্খতা। আমরা কেবল
    শরী‘আতের নির্দেশ পালনে আদিষ্ট।
    (৫) এছাড়াও আরো একটি যুক্তি পেশ
    করা হয় যে, সঊদী আরবের
    সাথে বাংলাদেশের মাত্র ৩
    ঘণ্টা সময়ের পার্থক্য থাকার
    কারণে পূর্ণ এক দিন পার্থক্য হবে কেন?
    উত্তরে বলব, ৩ ঘণ্টা কেন, ৩
    সেকেন্ডের আগ-পিছের কারণেও
    তো একটি দিনের ব্যবধান হতে পারে।
    যেমন একই সময়ে দু’টি শিশু জন্মগ্রহণ করল,
    একটি বাংলাদেশে এবং অপরটি সঊদী
    আরবে।
    বাংলাদেশে সময় তখন
    সন্ধ্যা ৭টা এবং আর সঊদী আরবে সময়
    তখন বিকাল ৪টা। এখন প্রশণ হ’ল, একই
    সময়ে জন্মগ্রহণ করা শিশু দু’টির
    আক্বীকা কি একই দিনে হবে, না দুই
    দিনে হবে? এর উত্তর হ’ল, অবশ্যই দুই
    দিনে। কারণ সঊদী আরবে বিকেল
    ৪টায় জন্ম গ্রহণ করা শিশুর ৭ম দিন আর
    বাংলাদেশে সন্ধ্যা ৭টায় জন্ম গ্রহণ
    করা শিশুর ৭ম দিন একই দিনে হবে না।
    বরং সঊদী শিশুর ৭ম দিন
    হবে বাংলাদেশী শিশুর ৬ষ্ঠ দিন।
    এক্ষণে একই সময়ে জন্মগ্রহণ করা দুই শিশুর
    আক্বীকা যদি দু’দিনে হ’তে পারে,
    তাহলে ৩ ঘণ্টা সময়ের পার্থক্যের
    কারণে ১ দিন কি পার্থক্য
    হতে পারে না? এই সমাধান বের করার
    জন্য কেবল সুস্থ বিবেকই যথেষ্ট। আল্লাহ
    সকলকে বুঝার তাওফীক দান করুন। আমীন!
    (৬) বর্তমানে বেশকিছু দেশ ছিয়াম
    পালন করে সঊদী আরবে উদিত চাঁদের
    অনুসরণে। আমাদের দেশের
    দক্ষিণাঞ্চলেও অনেক
    আগে থেকে কিছু কিছু
    গ্রামে সঊদী আরবকে অনুসরণ করা হয়।
    এখন প্রশ্ন হ’ল, শরীআতে এমন কোন ইঙ্গিত
    কি রয়েছে যে, সঊদী আরবের চাঁদই
    সারাবিশ্বের জন্য মানদন্ড হবে?
    তাহলে কিসের
    ভিত্তিতে সঊদী আরবকে মানদন্ড
    হিসাবে গ্রহণ করা হল? ‘চাঁদ
    দেখে ছিয়াম রাখ, চাঁদ দেখে ছিয়াম
    ছাড়’ হাদীছটির দূরবর্তী ব্যাখ্যা দাঁড়
    করালেও তো সঊদী আরব নয়;
    বরং সর্বপশ্চিমের ভূখন্ড আমেরিকার
    আলাস্কা প্রদেশকে অনুসরণ করতে হয়।
    সর্বোপরি ইসলাম একটি সহজ-সরল
    প্রাকৃতিক ধর্ম। সর্বযুগে সর্বাবস্থায় এর
    বিধান সমানভাবে কার্যকর।
    বর্তমানে স্যাটেলাইটের যুগ আসার
    কারণে একই দিনে একই সময়ে ছিয়াম ও
    ঈদ পালনের
    কথাটি জোরেশোরে উঠছে। কিন্তু
    একশত বছর পূর্বেও যখন স্যাটেলাইট ছিল
    না, তখনকার অনারব মুসলিম সমাজ
    কি তাহ’লে লাইলাতুল কদরের
    মর্যাদা লাভে বঞ্চিত হয়েছিল?
    তারা কি বিগত ১৩০০ বছর ধরে ছিয়াম
    নিষিদ্ধের দিন তথা ঈদের
    দিনে ছিয়াম রাখতে বাধ্য হয়েছিল
    কেবলমাত্র প্রযুক্তি জ্ঞানের
    অভাবে? স্বাভাবিক যুক্তিবোধ
    কি এটা কোনক্রমে সায় দেয়?
    এমনকি আধুনিক স্যাটেলাইটের যুগেও
    কি সর্বত্র সঠিক সময়ে সংবাদ
    পাওয়া সম্ভব? এর সাথে জড়িত
    সমস্যাগুলো চিন্তা করলে আদৌ সম্ভব
    নয়। যেমন-
    ক. আমেরিকায় (জিএমটি-৬) চাঁদ
    উঠেছে কি না তা জানতে কোরিয়ার
    (জিএমটি+৯) মুসলমানদের
    অপেক্ষা করতে হবে অন্ততঃ ১৫ ঘণ্টা।
    অর্থাৎ আমেরিকায় সন্ধ্যা ৬-টায়
    উদিত হওয়া চাঁদের সংবাদ কোরিয়ার
    মুসলমানরা পাবে স্থানীয় সময় পরদিন
    দুপুর ১১টায়। এমতাবস্থায় তারা ‘একই
    দিনে ছিয়াম ও ঈদ’ উদযাপনের
    মূলনীতি অনুসারে উক্ত
    ছিয়ামটি আদায় করবে কিভাবে, আর
    কিভাবেই বা সেদিনের তারাবীহ
    পড়বে? আরও পূর্বের দেশ
    নিউজিল্যান্ডের সাথে আমেরিকার
    সর্বপশ্চিম তথা আলাস্কার সময়ের
    পার্থক্য প্রায় ২৪ ঘণ্টা।
    তাহ’লে আমেরিকার চাঁদ ওঠার খবর
    নিউজিল্যান্ডবাসী পাবে পরদিন
    রাতে। তাহলে তাদের উপায়
    কি হবে? এমনকি বাংলাদেশেও
    আমেরিকার চাঁদ উঠার সংবাদ
    জানতে অপেক্ষা করতে হবে পরদিন
    ভোর ৬টা পর্যন্ত। অর্থাৎ সেই একই
    ঘটনা।
    তারা সেদিনের ছিয়ামও পাবে না,
    তারাবীহও পাবে না।
    খ. ধরা যাক বাংলাদেশের
    চট্টগ্রামে সাহারীর ৫ মিনিট
    পূর্বে খবর আসল যে, আমেরিকায় চাঁদ
    উঠেছে। এমতাবস্থায়
    চট্টগ্রামবাসী কোনক্রমে হয়ত
    সাহারী সম্পন্ন করল, কিন্তু
    রাজশাহীবাসী যাদের ব্যবধান
    চট্টগ্রাম থেকে ১৩ মিনিট
    তারা কি করবে? একই দেশে অবস্থান
    করেও তারা আর ছিয়াম
    রাখতে পারবে না। তাহলে একই
    দেশে কিছু লোক ছিয়াম রাখবে, কিছু
    লোক রাখবে না-ভাবুন তো কেমন
    বিদঘুটে অবস্থা তৈরী হবে?
    গ. কেবল চাঁদ দেখাই তো শেষ কথা নয়,
    প্রকৃতই চাঁদ
    দেখা গেছে কিনা তা সাব্যস্ত
    হতে হবে একটি দায়িত্বশীল কমিটির
    মাধ্যমে। এটাও যথেষ্ট জটিল ও
    সময়সাপেক্ষ কাজ। যেমন
    বাংলাদেশে কয়েক বছর
    পূর্বে হাতিয়ার একটি চরে কেউ একজন
    চাঁদ
    দেখতে পেলে সারা দেশে প্রচার
    হ’ল, অথচ চাঁদ
    দেখা কমিটি তা গ্রহণযোগ্য
    মনে না করায় চাঁদ
    দেখা যায়নি বলে রেডিও-
    টিভিতে ঘোষণা করা হয়েছিল। এ
    নিয়ে যথেষ্ট সমস্যা তৈরী হয়েছিল
    সে বছর। বাংলাদেশের মত ছোট
    দেশে যদি চাঁদ দেখা নিয়ে সমন্বয়ের
    এমন অভাব হয়, তবে সারা বিশ্ব
    পরিসরে বিষয়টি কত জটিল
    হতে পারে চিন্তা করা যায়?
    সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন
    আসে স্বভাবধর্ম ইসলামে কি এইরূপ
    জটিলতার কোন অবকাশ আছে? ইসলাম
    কি এমন বাস্তবতাবিবর্জিত ধর্ম? কখনই
    নয়; বরং এই অযৌক্তিক বিতর্ক
    একশ্রেণীর
    কল্পনাবিলাসী মস্তিষ্কের অপরিপক্ক
    চিন্তাধারা বৈ কিছুই নয়। এটুকু
    বোঝার
    জন্য বড়মাপের বিশেষজ্ঞ হওয়ারও
    প্রয়োজন নেই। তাই অর্থহীন
    যুক্তি পরিত্যাগ করে কুরআন ও
    হাদীছের সহজ-সরল জীবন পদ্ধতি অনুসরণ
    করাই কাম্য। সূর্য, চন্দ্র উভয়কেই
    সৃষ্টি করা হয়েছে বিশেষ উদ্দেশ্যে,
    যার অন্যতম হ’ল সময় ও দিনের হিসাব
    গণনা। প্রত্যেক এলাকার মানুষ স্ব স্ব
    স্থানীয় সময় মোতাবেক চন্দ্র মাস
    গণনা শুরু করবে- এটাই অনাদিকাল
    থেকে সুপরিচিত বিষয়,
    যেমনভাবে সৌরদিন সূর্যের স্থানীয়
    অবস্থান মোতাবেক নির্ধারিত হয়। এর
    বাইরে মানুষকে তার সাধ্যের
    অতিরিক্ত কিছুই চাপিয়ে দেয়া হয়
    নি। আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই
    সূর্যকে করেছেন দীপ্তিময়
    এবং চন্দ্রকে আলোকময় এবং তার জন্য
    নির্ধারণ করেছেন বিভিন্ন মনযিল,
    যাতে তোমরা জানতে পার বছরের
    গণনা এবং (সময়ের) হিসাব। আল্লাহ
    এগুলো অবশ্যই
    যথার্থভাবে সৃষ্টি করেছেন।
    জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য
    তিনি আয়াতসমূহ
    বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন’ (ইউনুস
    ৫) । সুতরাং এ নিয়ে বিতর্কের কোন
    অবকাশ নেই।
    পরিশেষে এ ব্যাপারে শায়খ
    উছায়মীন (রহঃ) -এর বক্তব্য
    এবং রাবেতা আলমে ইসলামীর
    ‘ইসলামী ফিকহ একাডেমী’র
    ফৎওয়া উদ্ধৃত করে এ আলোচনা শেষ
    করছি। শায়খ উছায়মীন (রহঃ) বলেন,
    ‘ভৌগলিক হিসাবে এটা অসম্ভব।
    কেননা ভূগোলবিদদের নিকট চাঁদের
    উদয়স্থল বিভিন্ন হয়,
    যেমনটি ইবনে তায়মিয়া উল্লেখ
    করেছেন। যুক্তির নিরিখে এই
    বিভিন্নতা থেকেই স্পষ্ট প্রতিভাত হয়
    যে, প্রতিটি শহরের জন্য হুকুম ভিন্ন
    ভিন্ন হবে।
    আর এ ব্যাপারে শারঈ দলীল হ’ল
    আল্লাহ বলেন, ﻓَﻤَﻦْ ﺷَﻬِﺪَ ﻣِﻨْﻜُﻢُ ﺍﻟﺸَّﻬْﺮَ ﻓَﻠْﻴَﺼُﻤْﻪُ
    ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস
    (রামাযান) পাবে, সে যেন ছিয়াম
    রাখে’ (বাকারাহ ২/১৮৫) ।
    যদি দেখা যায় পৃথিবীর প্রান্ত
    সীমানার দেশগুলো এ মাস পায়নি অথচ
    মক্কাবাসীরা ইতিমধ্যেই
    পেয়ে গেছে, এমতাবস্থায় আয়াতের
    হুকুমটি কিভাবে তাদের উপর আরোপ
    করা যেতে পারে, যারা এখনও পর্যন্ত
    মাসটি পায়নি? রাসূল (ছাঃ)
    বলেছেন, ﺻُﻮﻣُﻮﺍ ﻟِﺮُﺅْﻳَﺘِﻪِ ﻭَﺃَﻓْﻄِﺮُﻭﺍ ﻟِﺮُﺅْﻳَﺘِﻪِ ‏[ 8 ]
    সুতরাং উদাহরণস্বরূপ
    যদি মক্কাবাসীরা চাঁদ দেখে,
    তবে তার
    ভিত্তিতে কিভাবে আমরা
    পাকিস্তানবাসী কিংবা তার
    পূর্বদিকের রাষ্ট্রসমূহের অধিবাসীদের
    উপর ছিয়াম চাপিয়ে দিতে পারি,
    অথচ আমরা জানি যে তাদের
    আকাশে আদতে চাঁদ উদিতই হয়নি? অথচ
    রাসূল (ছাঃ) চাঁদ দেখাকে ছিয়ামের
    সাথে সম্পৃক্ত করেছেন।
    আর যুক্তিভিত্তিক দলীল হ’ল,
    আমরা জানি যে ভূপৃষ্ঠের পশ্চিম
    প্রান্তের আগে পূর্ব
    প্রান্তে প্রভাতরেখা উদিত হয়।
    সুতরাং প্রাচ্যের
    আকাশে প্রভাতরেখা উদিত হলেই
    কি আমরা পশ্চিম প্রান্তের মানুষ
    সাহারী ছেড়ে দেব, অথচ
    পশ্চিমে এখনও রাত অবশিষ্ট আছে? এর
    উত্তর হ’ল, না। তেমনিভাবে প্রাচ্যের
    আকাশে যখন সূর্য অস্তগামী হয়, তখন
    কি আমরা ইফতার করা শুরু করব, অথচ
    আমরা তখনও দিবাভাগেই রয়েছি? এর
    উত্তর হ’ল, না। সুতরাং হুকুমের
    ক্ষেত্রে চাঁদ ও সূর্য সম্পূর্ণ একই। চন্দ্রের
    হিসাব হয় মাসিক, আর সূর্যের হিসাব হয়
    দৈনিক।…অতএব যুক্তি ও দলীলের
    নিরীখে ছিয়াম ও ইফতারের
    ক্ষেত্রে প্রত্যেক স্থানের জন্য
    আলাদা বিধান হবে। যার সম্পর্ক
    হবে বাহ্যিক আলামত বা চিহ্ন দ্বারা,
    যা আল্লাহ্
    তা‘আলা কুরআনে এবং নবী (ছাঃ)
    তাঁর সুন্নাতে নির্ধারণ
    করে দিয়েছেন। আর তা হচ্ছে চাঁদ
    প্রত্যক্ষ করা এবং সূর্য বা ফজর প্রত্যক্ষ
    করা। মানুষ যে এলাকায়
    থাকবে সে এলাকায় চাঁদ দেখার উপর
    নির্ভর করে ছিয়াম ভঙ্গ করবে।[9]
    ‘রাবেতা আলমে ইসলামী’র
    ‘ইসলামী ফিকহ একাডেমী’ ১৯৮১
    সালে তাদের প্রকাশিত এক ফৎওয়ায়
    উল্লেখ করেছে যে, ‘ইবনে উমর (রাঃ)
    বর্ণনা করেছেন যে, ‘তোমরা চাঁদ
    না দেখা পর্যন্ত ছিয়াম রেখ
    না এবং চাঁদ না দেখে ছিয়াম ভঙ্গ
    করো না। আর যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন
    থাকে তাহলে গণনা করে (ত্রিশ দিন)
    পূর্ণ কর’।[10]
    এই হাদীছটির সাথে একটি সাবাব
    (কারণ) সংযুক্ত করা হয়েছে অর্থাৎ চন্দ্র
    দর্শন। সুতরাং হতে পারে যে মক্কা,
    মদীনায় চাঁদ দেখা গেলেও অন্য
    দেশে তা দেখা যায় নি।
    সেক্ষেত্রে অন্য দেশের
    অধিবাসীদেরকে দিনের
    আলো অবশিষ্ট থাকা অবস্থায় তৎক্ষণাৎ
    কিভাবে ছিয়াম পালন বা ছিয়াম
    ভঙ্গের নির্দেশ দেয়া যেতে পারে?
    প্রত্যেক মাযহাবের আলেমরাই
    বলেছেন যে, উদয়স্থলের বিভিন্নতা বহু
    আলেমের নিকট গ্রহণযোগ্য।
    ইবনে আব্দিল বার এ ব্যাপারে ইজমা‘
    উল্লেখ করেছেন যে, দূরবর্তী শহরসমূহ
    থেকে একই সময়ে চাঁদ দেখা যায় না;
    যেমন খোরাসান ও স্পেনের মধ্যকার
    দূরত্ব। তাই প্রতিটি দেশ বা শহরের জন্য
    ভিন্ন ভিন্ন হুকুম। তাছাড়া চার
    মাযহাবের বহু কিতাবে শারঈ
    দলীলের ভিত্তিতে উদয়স্থলের
    ভিন্নতাকে গ্রহণযোগ্য বলা হয়েছে।
    আর যুক্তির ক্ষেত্রে বলা যায় যে,
    উদয়স্থলের বিভিন্নতার
    ব্যাপারে কোন আলেমের মধ্যেই
    মতানৈক্য নেই।
    কেননা এটা একটা দৃশ্যমান ব্যাপার।
    ছালাতের নির্ধারিত সময়সহ
    শরীআতের অনেক হুকুম এর আলোকেই
    নির্ধারিত হয়েছে। তাই সার্বিক
    পর্যবেক্ষণে আমরা সিদ্ধান্ত
    নিতে পারি যে, উদয়স্থলের
    বিভিন্নতা একটি বাস্তব বিষয়।
    সুতরাং এর আলোকে ‘ইসলামী ফিকহ
    কমিটি’ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে যে,
    সারাবিশ্বব্যাপী একই দিনে ছিয়াম ও
    ঈদ পালনের আহবান জানানোর কোন
    প্রয়োজন নেই। কেননা এই ঐক্যের উপর
    মুসলিম উম্মাহর ঐক্য নির্ভর করে না,
    যেমনটি কোন কোন প্রস্তাবক
    দাবী করে থাকেন। বরং মুসলিম
    দেশসমূহের দারুল ইফতা ও বিচার
    বিভাগের উপরই চাঁদ দেখার
    বিষয়টি ছেড়ে দেয়া উত্তম। এতেই
    মুসলিম উম্মাহর জন্য অধিকতর কল্যাণ
    নিহিত রয়েছে। মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য
    আসতে পারে কেবলমাত্র জীবনের
    সর্বক্ষেত্রে কিতাব ও সুন্নাতের উপর
    আমল করার ব্যাপারে ঐক্যমত হওয়ার
    মাধ্যমে।[11]
    আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক
    বিষয়টি অনুধাবন করার তাওফীক দান
    করুন। আমীন!
    [1]. নাসাঈ হা/২১১৬ ।
    [2]. তিরমিযী হা/৫৫৯; আবুদাঊদ
    হা/২০৪৪ ।
    [3]. মির‘আত ৬/৪২৮ হা/১৯৮৯-এর ব্যাখ্যা ।
    [4]. মির‘আত ৬/৪২৯, হা/১৯৮৯-এর ব্যাখ্যা

    [5]. আবুদাউদ হা/১১৫৭, ২৩৩৯, মিশকাত
    হা/১৪৫০ ।
    [6]. ইবনে মাজাহ হা/১৬৫৩ ।
    [7]. বুখারী হা/১১৪৫; মুসলিম হা/৭৫৮;
    মিশকাত হা/১২২৩ ।
    [8]. মুত্তাফাক আলাইহ, মিশকাত
    হা/১৯৭০ ।
    [9]. ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম,
    পৃঃ ৪৫১ ।
    [10]. মুত্তাফাক আলাইহ, মিশকাত
    হা/১৯৬৯ ।
    [11]. ইসলামী ফিকহ একাডেমী (১২
    ফেব্রুয়ারী ১৯৮১ইং, ৪র্থ বৈঠক, ৭ম
    সিদ্ধান্ত, ﻓﻲ ﺑﻴﺎﻥ ﺗﻮﺣﻴﺪ ﺍﻷﻫﻠﺔ ﻣﻦ ﻋﺪﻣﻪ );
    রাবেতা আলমে ইসলামী, জেদ্দা,
    সঊদী আরব।

  2. দেশের বড় বড় রাজনৈতিক পারটিগুলু প্রতিযোগীতায় নেমেছে-তারা ধুমধাম করে ইফতার পারটি দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার কাজে ব্যস্ত।ধরমীয় কোন আলোচনা নেই সেখানে,আছে শুধু রাজনিতী।

আপনার মতামত বা প্রশ্ন লিখুন।

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s