সহজ ছোট ভাল কাজ

সহজ ছোট ভাল কাজ


নূসরাত রহমান
বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

আমাদের জীবনটা তো খুব ছোট। তার মধ্যে এক চতুর্থাংশ চলে যায় বড় হতে, শিখতে, বুঝতে। বড় হওয়ার পরেও তিন ভাগের একভাগ কাটে ঘুমিয়ে আর নিত্য প্রয়োজনীয় কাজ সারতেই। বাকি এত অল্প সময়টার মধ্যে পড়াশুনা, চাকরি, ব্যবসা – এসব করবো কী, সংসার চালাবো কী.. আর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজই বা করবো কী?

আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করাও তো চাট্টিখানি কথা নয়, আগে জানতে ও বুঝতে হবে, নিয়্যতটাকে পরিষ্কার করতে হবে, তবেই না!

এসব সেরে, সংসারের দায়িত্ব সেরে হিসেব মেলাতে গেলে দেখা যায়, ওমা! কবে জীবনের দুই তৃতীয়াংশ শেষ করে ফেলেছি, টেরই পাইনি! এখন এই শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে দানের টাকা দিয়ে ফেলা, একটু বেশি করে তজবি জপা.. সারাদিন জায়নামাজে বসে থাকা- এসব করতে হয়।

কিন্তু ওসবেও তো সমস্যা। আল্লাহ তো চান ভারসাম্যপূর্ণ জীবন। যখন যেখানে সুবিধা সেখানে হেলে পড়লে তো আর ভারসাম্য হলো না। আল্লাহ চান আপনি যখন অফিসের কাজে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখনও আল্লাহকে খুশি করুন, ছেলে মেয়ের পরীক্ষা পরদিন সকালে – সিলেবাস শেষ করাতে করাতে আল্লাহকে মনে করুন.. এমন। তাহলে কীভাবে তা সম্ভব?

এজন্যই, আমরা দিনের একেবারে খুঁটিনাটি ঘটনায় আল্লাহকে এনে ফেললে আর দিন শেষে তজবির ওপর ভরসা করে থাকতে হবে না।

এখানে অত্যন্ত সরল সোজা কিছু করণীয় দেওয়া হলো:

  • প্রতিদিন একটু হাঁটা হয়না? হাঁটার সময়টা কী করেন আপনি? পা দিয়ে তো হাঁটাই হয়, মনটা দিয়ে কী করা হয়? কিছুই না, তাইনা? এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখা, আগের বা পরের কিছু ভাবা- এসবই তো! এখন থেকে হাঁটার ছন্দের সঙ্গে ছোট দু`আ (যেমন সুব-হা-নাল্লাহ, ওয়ালহাম-দু-লিল্লাহ, ওয়ালা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু-আক্ব-বার, অথবা সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী সুবহানাল্লাহিল আযীম) মিলিয়ে পড়তে পড়তে হাঁটবেন। প্রথম প্রথম মনেই থাকবে না পড়ার কথা। তারপর একটা সময়ে পুরোপুরি প্রোগ্রাম সেট হয়ে যাবে মাথার ভেতর। দিনে কতো কদম হাঁটা হয়? দু’হাজার? প্রতি ষোল কদমে যদি একবার করে দু`আটা শেষ করা হয়, দিন শেষে কতোগুলি নেকি জমা পড়লো কোনো কষ্ট ছাড়াই?
  • এই তো গেল হাঁটা। গোণাগুণির কাজ করতে হয়না? আটটা ডিম, ছ`টা কলম, তিন তলা, কুড়িটা সিঁড়ি? এক দুই তিন করে না গুণে `সুবহানাল্লাহ` `ওয়ালহামদুলিল্লাহ` `ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু` `ওয়াল্লাহু আক্ববার` – এভাবে চার চার করে গুণে ফেলুন। একদম কোনো ঝামেলা ছাড়া আরও আট দশবার দুআ পড়া হয়ে যাবে। গায়েই লাগবেনা।
  • তারপর নতুন সূরা শেখা হয়না কতো বছর হলো? শিখতে চান? পছন্দের তিলাওয়াতকারীর তিলাওয়াতের এমপিথ্রি চালিয়ে দিয়ে রাখুন মোবাইলে, গাড়িতে, ঘর গুছানোর সময় – গানের মতো পুরোটা মাথায় কপি হয়ে যাবে দু`সপ্তাহ পর। এভাবে শুনে শেখার আরও সুবিধা হচ্ছে উচ্চারণও শুদ্ধ হবে, কোথায় কতোটুকু বিরতি দিতে হবে, সব জানা হয়ে যাবে।
  • ক্লাসে যাবেন, বাজারে যাবেন, অফিসে যাবেন, জ্যামে বসে আছেন, মেজাজটা তিরিক্ষি – সময়টা কাজে লাগান একটা অডিও লেকচার শুনে। সেটা হতে পারে কুরআনের তাফসির, নবীদের জীবনী, পারিবারিক সম্পর্কের ওপর ইসলামিক আলোচনা.. শুধু যে মেজাজ রক্ষা পাবে তাই না, অলস সময়টাতে অনেক ভাল ভাল চিন্তা মাথায় চলে আসৃবে। হঠাৎই হয়তো মনে হবে, `আরে! এই কাজটা তো করা যায়!` ব্যাস, কোনো রিকশাওলা কোনো দিক দিয়ে ঢুকে গেল – এসব দেখে আর মেজাজ খারাপ হবে না। আপনি তো আর আপনার সময় নষ্ট করছেন না! ওরা যা ইচ্ছে করুক না!

এগুলো ছিল একদম কোনো আয়াস ছাড়াই সওয়াব কুড়ানোর পদ্ধতি। এবার আসি একটু শ্রম দিতে হয় এমন কাজে।

  • বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে ভাল লাগে? তক্কে তক্কে থাকুন, কখন অসুস্থ হয় (তাই বলে আবার দোয়া করতে যাবেন না যেন অসুখে পড়ে); হলেই মিস নেই, দেখতে যান, ফোন করে খোঁজ নিন, অন্য সময়ের চেয়ে দুইবার বেশি ফোন দিন। শুধু বন্ধুর অসুখই না, বন্ধুর পরিবারের যে কারোর বেলায়ও। আল্লাহ ভীষণ খুশি হন এসব কাজে। আর তার ওপর যদি আল্লাহকে খুশি করার নিয়তে করেন, তাহলে তো ডাবল লাভ!!
  • দাওয়াতে মুরুব্বী কারও সঙ্গে দেখা হয়? নানু দাদু শ্রেণীর, যারা কোনো অনুষ্ঠানে গেলে চুপচাপ এক কোণে বসে থাকেন, সবাই দেখা হলে সালাম দিয়ে চলে যায়, কিন্তু কথা বলে না। এমন বয়সীদের পাশে গিয়ে বসে কথা বলতে শুরু করুন। এমনভাবে আধা ঘণ্টা গল্প করুন, যাতে তাঁর মনে হয় এই সমাবেশে তার সঙ্গে সময় কাটিয়েই আপনি সবচেয়ে বেশি মজা পাচ্ছেন। চলে আসার সময় দেখবেন প্রাণঢালা দোয়ার ওজনে হাঁটতে পারছেন না।
  • পরিচিত মানুষজনের সঙ্গে এমনভাবে নরম করে কথা বলা শুরু করুন, যাতে কেউ সমস্যায় পড়লে আপনার কাছে বলতে ভরসা পায়।

তারপর সমাধান করতে পারেন না পারেন, একটু সুন্দর করে বলুন, `হ্যা… সত্যিই তো… আসলেই তো সমস্যা… ধৈর্য ধরে থাকেন ভাই! আপনার তো অনেক ধৈর্য মাশাআল্লাহ!` হয়ে গেল! সে ভাই খুশি, আল্লাহ খুশি, আপনি খুশি। খুশিই খুশি।

  • যদি দেখেন কেউ একটা ভাল উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু কাজটা সুন্দর করে হয়নি দেখে অনেক সমালোচনা করছে সবাই… খুব উৎসাহ দেখান। বলুন, জিনিসটা খুবই ভাল হয়েছে। সে যখন উৎসাহে টগবগ করতে থাকবে – তখন না হয় সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে খুঁতগুলো ঠিক করার পরামর্শ দেবেন। ভাল কাজে এই যে উৎসাহ দিলেন, চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন – এতে আল্লাহ সে ভাল কাজের সওয়াবে আপনারও একটা অংশ লিখে রাখবেন ইনশাআল্লাহ।
  • আবারো ফিরে আসি হাঁটার কথায়। চাইলে এক জোড়া গ্লাভস/পলিথিন সঙ্গে করে বের হতে পারেন। রাস্তায় ঠোঙা, পেপসির ক্যান, পলিথিন, কাঁটা পড়ে থাকতে দেখলে তুলে ডাস্টবিনে ফেলে দেবেন। রাস্তার জিনিস পলিথিন মোড়া হাত দিয়ে ধরলে কিন্তু হাত খসে পড়ে যায় না (আমরা টাকা ধরার সময় আরও অনেক জীবাণু ধরি)। কিন্তু এসব কাজে বিনা খরচে সদকা আদায় হয়।

লেখক: যুক্তরাষ্ট্রে জীববিজ্ঞান বিষয়ে পিএইচডি করছেন।

সম্পাদনা: শিমুল সুলতানা

মেইল: bn24.islam@gmail.com

আপনার মতামত বা প্রশ্ন লিখুন।

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s