ভিন দেশে ঈদ

 

ভিন দেশে ঈদ

আ ই মা ন হা মি দ

ঈদের তাৎপর্য নিয়ে অনেক তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা থাকতে পারে, তবে বাস্তব জীবনে সবকিছুকে ছাপিয়ে উঠে ঈদ নিয়ে মানুষের পার্থিব আকাঙ্ক্ষা ও অতীত সুখ স্মৃতি। “ধর্মীয় উৎযাপনকে কারবারের উপলক্ষ্য করা” বর্তমান আধুনিকতার অনন্য নিদর্শন। শুরুটা করেছিল পশ্চিমারা, সান্তাক্লজের স্বর্গীয় রথকে তারা তুষারাবৃত মর্ত্যলোকে চালিয়েছেন। বিপণী বিতান ভরিয়ে তুলেছেন সান্তাক্লজ ও মাদার মেরীর পার্থিব ও ক্ষুদ্র সংস্করণে! মানুষকে বুঝাতে চেয়েছেন ঐ যে দেখো ঈশ্বর তোমার হাতের নাগালে!! আমাদের এক তরুণ শিক্ষক তার স্বল্পকালীন অভিজ্ঞতায় যথার্থই বলেছেন দেয়ার “ইজ নো রিলিজিয়াসনেস ইন রিলিজিয়াস ফেস্টিভ্যাল ইন অ্যামেরিকা”

উন্নত বিশ্বের ভোগ যে তৃতীয় বিশ্বে উপভোগে রূপান্তরিত হয় তার নজির অতীতে আমরা বহুবার দেখেছি। ঈদের ক্ষেত্রেও তার ব্যাতিক্রম কেন হবে! আর আমাদের সাংস্কৃতিক ট্রানজিট যেহেতু ভায়া মুম্বাই, তাই ঈদের বাজারে দেখতে পাই দেবদাস, মাসাক্কালি ইত্যাদি নামের কিছু উদ্ভট মৌলিক উপযোগ। যেই সবল তরুণটি নিয়মিত ব্যায়ামাগারে ক্যালরি পুড়িয়েও শুধু মাত্র স্বাস্থ্য হানির ভয়ে সাওম পালন থেকে বিরত থাকে, তাকে দেখি ঈদের দিন আড়ংএর সবচাইতে দামী ও উজ্জল পাঞ্জাবী পরিধান করে শুভেচ্ছা বিতরন করতে। স্বজাতীয়দের রাম ধোলাই পড়েও করা যাবে। তার আগে আপনাদের সাথে আমার ভিন দেশের ঈদের কিছু অংশ তুলে ধরছি।

প্রবাস যাপনের তৃতীয় ঈদ ( ঈদ উল ফিতর) উৎযাপন করলাম কাল। তবে অন্যবারের তুলনায় এবারের ঈদটি একটু ব্যাতিক্রম। অফুরন্ত সময়, সাথে দশ দিন করে এগিয়ে আসা আরবি সনের ফযিলতে, কাকতালীয়ভাবে আমার ঈদ ও জন্মদিন মিলেমিশে একাকার। গত ঈদে ছিলাম পূর্ণকালীন চাকুরীজীবী, এই ঈদে ছাত্র। ব্যাপারটি অনেকটা স্বামী হওয়ার পূর্বে পিতৃত্ব লাভের মতো!

যাহোক ১৯শে আগস্ট সকালে অগ্রজ বন্ধুবান্ধব সহকারে ছুটলাম ঈদগাঁ তে। ব্রুকলিন ইসলামিক সেন্টারের উদ্যোগে প্রসপ্যাক্ট পার্ক সংলগ্ন খোলা মাঠে মিলিত হয় নেইবরহুডের অধিকাংশ মানুষ। মহিলাদের জন্যও ছিল ঈদের নামাজ আদায়ের আলাদা সু ব্যাবস্থা। মুসলিম উম্মাহ অফ নর্থ অ্যামেরিকার (MUNA) আলেমদের খুতবা ও সমসাময়িক বিষয়ের উপর দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য ছিল বেশ শিক্ষণীয়। সেদিন ২৭শে রমজানের ইফতারির পর মসজিদে এক বাংলাদেশী তরুণের স্পীচ শুনছিলাম। এলাকার অনেকের মতো সে রমজেনের শেষ দিনগুলোতে ইতেকাফে এসেছে। তিশ মিনিটের বক্তব্যে ছিল পিনপতন নীরবতা। জন্ম থেকে প্রবাসে বেড়ে উঠা, সদ্য কৈশর পার করা তরুণের ধর্মীয় উপলব্দি ও জ্ঞানের গভীরতা আমাকে বেশ অবাক করেছে। আমাদের সমাজে যেইটা ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা দেখি সবচাইতে কম মেধাবী ছেলেরা ধর্ম প্রচারে নিয়জিত। কিন্তু বাইরের বিশ্বে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন, তারা পার্থিব পেশা ও ধর্মীয় জ্ঞানে সমানভাবে দক্ষ ও যোগ্যতা সম্পন্ন। পাশাপাশি একত্রে মসজিদে সালাত আদায়ের ক্ষেত্রেও মহিলাদের অংশগ্রহণ ও দৃষ্টিভঙ্গি সত্যিই লক্ষনীয়। ঈদ নিয়ে অতীত স্মৃতি রোমন্থন করলে, আমি বার বার শৈশবের ফেলে আসা দিনগুলোতে ফিরে যাই। তখন ঈদ হতো ডিসেম্বার-জানুয়ারিতে। ঘুম থেকে উঠে প্রত্যুষে হাড়কাঁপানো শীতে পেছনে থেকে ধাক্কা দিয়ে পুকুরে ফেলা, কিংবা গ্রামের সহজ সরল মানুষদের ভিড়ে কুয়াশাচ্ছন্ন শিশিরভেজা ঈদগাঁতে খুতবা শুনা, মোনাজাতের সময় চোখ বন্ধকরে কচকচে সালামির নিকাশ করা, দিঘীর পাড়ের শতবর্ষী বটের ছায়াতলে ক্ষণস্থায়ী ঈদমেলা, বিকেলে হাটে গ্রাম্য সার্কাস ইত্যাদি আজ ফেলে আসা ধুসর অতীত।

এখন ঈদ মানে একটু আয়েশ করে বেশিক্ষন ঘুমিয়ে ঘুমের ডেফিসিট পূর্ণ করা। অনেকের ভাগ্যে তাও জুটেনা! কোনমতে নামায শেষ করেই ছুটতে হয় জীবিকার সন্ধানে। আমার মতো ব্যাচেলরদের ঈদতো আরও ভয়ংকর! ঈদ নিয়ে এক সময়ের রঙিন স্বপ্নগুলো আজ ক্লোরোফিলহীনতায় ধুকছে। সমাজ নির্ধারিত সাফল্যলাভে ঈদকে আমি উপযোগের পাল্লায় মাপি। প্রতিষ্ঠিত অর্জনের আশায় প্রকৃতি আমায় বড় করে দেয়। আমি চাইলেও ফিরে যেতে পারিনা কাঙ্ক্ষিত অতীতে।সুখের চাইতে আজ সাফল্য আমাকে বেশি তাড়িত করে। তাইতো আজ তথাকথিত সাফল্যের মহাসড়ক যেমন সম্প্রসারিত হছে তেমন করে ব্যাস্তানুপাতিক হারে সঙ্কুচিত হচ্ছে সুখানুভূতির শিরা-উপশিরা।

আমি খানিকটা বিপ্লবী ও প্রতিবাদী হয়ে উঠতে চাইলেই সমাজ আমায় রক্তচক্ষু দেখায়। মাঝে মাঝে বাস্তবতার অজুহাতে আস্তাকুড়ে ফেলার ভয়ও দেখায়। নিকট কোন অভ্যুত্থানের আশায় আমি মিনমিন করে নেতিয়ে যাই।

হয়তো আরণ্য ভেদ করে একদিন লোকালয়ের দেখা নিশ্চই পাব। হয়তো সেদিন ত্যাগের সুখস্রোতে খড়কুটের মতো ভেসে যাবে জাগতিক সব আরোপিত অনুযোগ। হয়তো সেদিন ত্যাগ রূপান্তরিত হবে অর্জনে। কেবল সেদিনই উৎযাপনের ঈদ তথাকথিত উপভোগের খোলস মুক্ত হবে। সেই পর্যন্ত ঈদ মুবারক।

লেখক: আমেরিকায় উচ্চশিক্ষারত।

প্রবাসীপত্র.কম/আমা.

ইন্দোনেশিয়ায় ঈদের মাঠে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অংশ গ্রহনের একটি দৃশ্য

সউদী আরবের রিয়াদস্থ আল আহলী ফুটবল ক্লাবের স্টুডিয়াম মাঠে ঈদুল ফিতরের সালাতের জন্য সউদী ও প্রবাসীদের উপস্থিতি

ইথিউপিয়ায় একটি ঈদের দৃশ্য

আমেরিয়কায় খেলার মাঠে ঈদের সালাতের জন্য উপস্থিতি

আপনার মতামত বা প্রশ্ন লিখুন।

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s