বন্ধু ও বন্ধুত্ব

বন্ধু ও বন্ধুত্ব

আল্ হামদুলিল্লাহ, ওয়াস্ সালাতু ওয়াস্ সালামু ‘আলা রাসূলিল্লাহ, আম্মা বাদ:

মানবকুল সামাজিক, তাই তারা সমাজের সদস্যদের সাথে বসবাস করে, উঠা-বসা করে, লেন-দেন করে এবং বন্ধুত্ব করে। এসব অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বভাবগতভাবেই সংঘটিত হয়। তবে বন্ধু নির্বাচন ও বন্ধুত্ব করনের বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ এই পয়েন্ট থেকে অনেকের জীবন ভাল কিংবা মন্দের দিকে মোড় নেয়। কেউ সত্যিই বলেছেনঃ ‘সৎ সঙ্গ তোমাকে সৎ বানায় আর অসৎ সঙ্গ তোমাকে অসৎ করে তোলে। পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার ইসলামে, এ বিষয়ও রয়েছে কিছু উপদেশ কিছু গাইড লাইন। আমরা এই স্থানে তারই কিছুটা বর্ণনা করার প্রয়াস পাবো ইনশাআল্লাহ।

বন্ধু নির্বাচনঃ বন্ধুত্বর প্রথম ধাপ হচ্ছে বন্ধু চয়ন। কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করার পূর্বে আমাদের তার সম্পর্কে জানা উচিৎ, যে আমরা কার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে চলেছি। যদি কেউ এই স্টেপেই ভুল করে দেয় , তাহলে তার পরিণাম ভয়ংকর হতে পারে। কারণ আমরা লক্ষ্য করি, সাধারণত: জুয়াড়ির বন্ধু জুয়াড়ী হয়, চোরের বন্ধু চোর হয়, আর নামাযীর বন্ধু হয় নামাযী । তাই বন্ধু নির্বচনের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ

” الرجل على دين خليله فلينظر أحدكم من يخالل” رواه الترمذي في أبواب الزهد

অর্থঃ “মানুষ তার বন্ধু স্বভাবী হয়, তাই তাকে লক্ষ্য করা উচিৎ যে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।” ( তিরমিযী, যুহুদ অধ্যায়, নং ২৪৮৪)

একদা এক বেদুইন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জিজ্ঞাসা করেঃ কিয়ামত কবে হবে? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বলেনঃ তার জন্য কি প্রস্তুতি নিয়েছো? লোকটি বলেঃ (নফল) নামায, রোযা, সাদাকা হিসাবে বেশী কিছু আমার নেই কিন্তু আমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে ভালবাসি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “তাহলে তুমি তার সাথে হবে যাকে তুমি ভালবাসো। (মুসলিম, নং ২৬৩৯)

আলকামাহ (রহঃ) বলেনঃ  “বন্ধুত্ব কর তার সাথে, যার সাহচর্য তোমাকে সুন্দর করে, তুমি অভাব গ্রস্থ হলে তোমাকে সাহায্য করে, ভুল বললে তোমার ভুল সংশোধন করে, যদি তোমার মধ্যে কোন মঙ্গল দেখে, তো গুণে গুণে রাখে, যদি তোমার মধ্যে কোন ত্রুটি দেখে তো শুধরে দেয়, যদি তার কাছে চাও তো সে দেয়, কঠিন সময়ে তোমাকে সান্তনা দেয়, আর তাদের নিম্ম স্তরের সে, যে তোমার কোন অন্যায় করে না।”

আউযায়ী (রাহঃ) বলেনঃ ‘ বন্ধু বন্ধুর জন্য তালির (কাপড়ের টুকরার) ন্যায়, যদি আসল কাপড়ের মত না হয়, তো অশোভনীয় করে দেয়’।

কতিপয় আরবী সাহিত্যিক বলেনঃ ‘ শুধু তার সাথেই বন্ধুত্ব করো, যে তোমার দোষ গোপন রাখে, দুঃখের সময় সাথে থাকে, প্রয়োজনীয় বিষয়ে তোমাকে অগ্রাধিকার দেয়, তোমার ভাল কাজের প্রচার করে এবং মন্দ কাজ গোপনে রাখে। আর যদি এইরকম গুণাগুণের কাউকে না পাও, তবে নিজেকেই নিজের সাথী মনে কর’।

কতিপয় আলেম বলেনঃ বন্ধুত্ব কর কেবল নিম্নোক্ত দু শ্রেণীর মানুষের সাথে। এক: তার সাথে যে তোমাকে দ্বীনের শিক্ষা দেয়, যার দ্বারা তুমি উপকৃত হও। দুই: তার সাথে যাকে তুমি দ্বীনের শিক্ষা দাও আর সে তা গ্রহণ করে। উক্ত প্রকার ছাড়া তৃতীয় প্রকার হতে দূরে থাক।”

সৎ সঙ্গ এবং অসৎ সঙ্গের উপমাঃ

বন্ধু ও বন্ধুত্বের বিষয়ে আমরা একটি সুন্দর উপমা জানবো , যেটি প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পেশ করেছেন, যেন আমরা জানতে পারি যে আমাদের কী ধরণের বন্ধু চয়ন করা প্রয়োজন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

( مَثلُ الجليسِ الصالح والجليس السوء كمثل صاحبِ المِسكِ و كيرِ الحدّادِ: لا يعدمك من صاحب المسك إمّا تشتريه أو تجدُ ريحَه، و كيرُ الحداد يُحرك بيتَك أو ثوبك أو تجدُ منه ريحا خبيثة ) رواه البخاري في كتاب البيوع

অর্থঃ ‘‘সৎ সঙ্গী এবং অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হচ্ছে আতর বিক্রয়কারী এবং কামারের হাপরের ন্যায়। আতর ওয়ালা তোমাকে নীরাশ করবে না; হয় তুমি তার কাছ থেকে ক্রয় করবে কিংবা তার নিকট সুঘ্রাণ পাবে। আর কামারের হাপর, হয় তোমার বাড়ি জ্বালিয়ে দিবে, নচেৎ তোমার কাপড় পুড়িয়ে দিবে আর নাহলে দুর্গন্ধ পাবে।” )বুখারী, অধ্যায়, ক্রয়-বিক্রয়, নং২১০১(

এমন বন্ধুত্ব, যার বিনিময় জান্নাতঃ

বন্ধুত্ব অনেক কারণে অনেক উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে; কিন্তু কেবল এক প্রকার বন্ধুত্ব রয়েছে যা মানুষের ইহকাল ও পরকালের জন্য কল্যাণকর। সেটা এতই মহৎ বন্ধুত্ব যার বিনিময় জান্নাত। সেই বন্ধুত্ব হচ্ছে, আল্লাহর কারণে বা আল্লাহর উদ্দেশ্যে বন্ধুত্ব। অর্থাৎ কোন মুসলিম অন্য মুসলিম ভাইর সাথে এই কারণে বন্ধুত্ব স্থাপন করে যে, সে আল্লাহকে ভালবাসে, আল্লাহর আদেশ নিষেধ মেনে চলে। তার মাল-সম্পদ, মান-সম্মান, সৌন্দর্যতা ইত্যাদির কারণে নয়। এই প্রকার বন্ধুত্বের অফুরন্ত ফযীলত ও সুফল সম্পর্কিত কয়েকটি হাদীস নিম্মে দেখা যেতে পারেঃ

১- কিয়ামত দিবসে আরশের ছায়া তলে স্থানঃ

عن أبي هريرة ، قال : قال رسول الله صلى الله عليه و سلم: ” إن الله يقول يومَ القيامة: أين المتحابّون بجلالي ، اليوم أظلهم قي ظلّي ، يوم لا ظل إلا ظلي “. رواه مسلم

অর্থঃ আবু হুরাইরা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআ’লা বলবেনঃ আমার মর্যদার (আনুগত্বের) কারণে পরস্পরে বন্ধুত্বকারীরা কোথায়? আজ আমি তাদের আমার ছায়াতলে ছায়া দিব, যেদিন আমার ছায়া ব্যতীত কোন ছায়া নেই।” (মুসলিম, অধ্যায়, বির ওয়াস্ সিলা, নং ২৫৬৬)

২- আল্লাহর ভালবাসা অর্জনঃ

আবূ হুরাইরা (রাযিঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেনঃ ‘‘এক ব্যক্তি নিজ গ্রামের বাইরে অন্য গ্রামে তার ভাইর সাথে সাক্ষাৎ করে, ফলে তার রাস্তায় আল্লাহ তায়ালা এক ফেরেশতাকে পাহারাদার হিসাবে নির্ধারণ করেন, অতঃপর যখন সে তার নিকটে পৌঁছে, তখন ফেরেশতাগণ বলেঃ কোথায় যাচ্ছ? সে উত্তরে বলেঃ এই গ্রামে এক ভায়ের কাছে যাচ্ছি। ফেরেশতা বলেঃ ওর প্রতি তোমার কোন অনুগ্রহ আছে কি, যা তুমি সম্পাদন করতে যাচ্ছ? সে বলেঃ না, কিন্তু আমি তাকে আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসি। ফেরেশতা বলেঃ আমি তোমার নিকট আল্লাহর দূত, আল্লাহ তোমাকে ভাল বেসেছেন, যেমন তুমি তাকে আল্লাহর ওয়াস্তে ভাল বেসেছো।”  (মুসলিম, অধ্যায়ঃ বির ওয়াস্ সিলাহ্, নং২৫৬৭)

৩- ফেরেশতাগণের এবং দুনিয়াবাসীর ভালবাসা লাভঃ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ‘‘ আল্লাহ যখন কোন বান্দাকে ভালবাসে, তখন জিব্রীল (আঃ) কে ডেকে বলেনঃ আমি অমুককে ভালবাসি তাই তুমিও তাকে ভালবাসো। বর্ণনাকারী বলেনঃ তখন তাকে জিব্রীল (আঃ) ভালবাসেন অতঃপর আকাশে ডাক দিয়ে বলেনঃ আল্লাহ তা’আলা অমুককে ভালবাসেন তাই তোমরাও তাকে ভালবাসো। অতঃপর আকাশবাসী তাকে ভালবাসে। বর্ণনাকারী বলেনঃ তারপর পৃথিবীতে তার গ্রহনযোগ্যতা  দিয়ে দেয়া হয়। (ফলে লোকেরা তাকে ভালবাসে, পছন্দ করে)। আর আল্লাহ যখন কোন বান্দাকে অপছন্দ করেন, তখন জিব্রীলকে ডাক দিয়ে বলেনঃ আমি অমুককে ঘৃণা করি, তাই তুমি তাকে ঘৃণা করো, তখন জিব্রীল (আঃ) তাকে ঘৃণা করে এবং আকাশবাসীকে সংবাদ দিয়ে বলেঃ আল্লাহ তায়ালা অমুককে অপছন্দ করে, তাই তোমরাও তাকে অপছন্দ করো। বর্ণনাকারী বলেনঃ তাই তারা সকলে তাকে অপছন্দ করে এবং যমীনেও সে অপছন্দনীয় হয়।” (মুসলিম, অধ্যায়, বির ওয়াস্ সিলাহ, নং ২৬৩৭)

৪- পূর্ণ ঈমানের পরিচয়ঃ

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “যে আল্লাহর (সন্তুষ্টির) উদ্দেশ্যে ভালবাসে এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঘৃণা করে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে দান করে কিংবা না করে, সে তার ঈমান পূর্ণ করে নিল।” ( আবূ দাউদ, সূত্র হাসান)

কেউ কাউকে ভালবাসলে তাকে তা জানিয়ে দেয়া প্রয়োজন:

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ‘‘তোমাদের মধ্যে যদি কেউ কোন ভাইকে ভালবাসে, তাহলে সে যেন তাকে  জানিয়ে দেয়।” (তিরমিযী, অধ্যায়, যুহুদ, নং২৫০২, আহমদ, আবু দাউদ)

 তিরমিযীর ভাষ্যকার মুবারকপূরী বলেনঃ “এটা এ কারণে যে, যখন সে তাকে এ বিষয়ে জানাবে, তখন তার অন্তর নরম হবে এবং তার ভালবাসা অর্জন হবে, ফলস্বরূপ সে তাকে ভালবাসবে এবং মুমিনদের মাঝে মৈত্রী বন্ধন স্থাপিত হবে ও মতভেদ দূর হবে।” (তুহ্ফাতুল আহ্ ওয়াযী,৭/৬০)

পরিশেষে, মহান আল্লাহর নিকট দুআ করি তিনি যেন আমাদের সৎ হওয়ার এবং সৎ লোকদের সংস্পর্শে থাকার এবং আল্লাহর ওয়াস্তেই বন্ধুত্ব করার তাউফীক দেন। আমীন।

লেখক:

শাইখ আব্দুর রাকীব (মাদানী)

দাওয়াহ সেন্টার, খাফজী, সউদী আরব।

সম্পাদনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী

পরিচালক:

www.salafibd.wordpress.com

আরও পড়ুন: কাউকে বন্ধু বা শত্রু হিসাবে গ্রহণ করার মূলনীতি কী?

3 thoughts on “বন্ধু ও বন্ধুত্ব

আপনার মতামত বা প্রশ্ন লিখুন।

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s